বরিশাল নগরীতে ১৫ কোটি টাকার অর্পিত সম্পত্তি বেহাত
তপন বসু, বরিশাল
অ+ অ-প্রিন্ট
সরকারী কর্মকর্তা হয়েও ভূমিদস্যুদের পক্ষে ও সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার ঘটনায় পুরো নগরীজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। অসদ উপায়ে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে সরকারী দায়িত্বশীল ওই কর্মকর্তার সহযোগিতায় ১নং খাস খতিয়ানের জন্য প্রস্তাবিত বরিশাল নগরীর ২৫ নং ওয়ার্ডের রুপাতলী মৌজার (র‌্যাব-৮ এর স্থায়ী কার্যালয়ের সামনে) ৭২ শতক সম্পত্তি অতিসম্প্রতি ভূমিদস্যুদের নামে রেকর্ড সংশোধনের আদেশ প্রদান করা হয়েছে। এতে করে একমাত্র সরকারের প্রাপ্য প্রায় ১৫ কোটি টাকার সম্পত্তি বেহাত হতে চলেছে।

এ ঘটনায় সচেতন নগরবাসী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জরুরি ভিত্তিতে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে ওই সরকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণসহ ভূমিদস্যুদের কবল থেকে মালিকবিহীন হিন্দু সম্প্রদায়ের (খ) তফসিলভূক্ত অর্পিত সম্পত্তি ও ১নং খাস খতিয়ানের জন্য প্রস্তাবিত সম্পত্তি রক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক, দুর্নীতি দমন কমিশন ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, রুপাতলী মৌজার জেএল ৫৬, এসএ ১৮৫০ খতিয়ানের ১১৪৬নং দাগের ৭২ শতক সম্পত্তির মূল মালিক রুপাতলী এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের জনৈক হারান চন্দ্র পালের পুত্র যতীন্দ্র নাথ ও জিতেন্দ্র নাথ। দীর্ঘদিন থেকে যতীন্দ্র নাথ ও জিতেন্দ্র নাথ এবং তাদের কোন বৈধ ওয়ারিশের কোন খোঁজ না থাকায় প্রায় ১৫ কোটি টাকার ওই সম্পত্তির ওপর লোলুপ দৃষ্টি পরে স্থানীয় কতিপয় ভূমিদস্যুর।

বরিশাল সদর উপজেলার জাগুয়া ও রায়পাশা-কড়াপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা দেশপ্রিয় চক্রবর্তীর ২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বরের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এসএ রেকর্ডীয় মালিক যতীন্দ্র নাথ ও জিতেন্দ্র নাথের ৭২ শতক সম্পত্তি ৫৪ ধারায় ১৯৬০-৬২ সালের ৩৯১২ নং নামজারী মামলায় ১৯৬২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তারিখের আদেশে ওই সম্পত্তি জনৈক মেছের উদ্দিন হাওলাদারের পুত্র আব্দুল মজিদ হাওলাদারের নামে ভুল নোট (ডিগ্রি) দেখা যায়। পরবর্তীতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্মকর্তার লিখিত আদেশে তালাস অনুসন্ধান করে দেখতে পান ৫৪ ধারায় ১৯৬০-৬২ সালের ৩৯১২ নং কেটি নামজারী কোন মামলাই হয়নি। সরেজমিন তদন্তে উল্লেখিত খতিয়ানের এসএ রেকর্ডীয় মালিকগন ও তাদের কোন বৈধ ওয়ারিশ না পাওয়ায় ৭২ শতক সম্পত্তি “খ” তফসিলভূক্ত অর্পিত সম্পত্তির তালিকাভূক্ত ছিলো মর্মে দেশপ্রিয় চক্রবর্তী বরিশাল সদর উপজেলার সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) লিখিত প্রতিবেদন দাখিল করেন।

২০১৫ সালের ১০ মে এক আদেশে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ ইলিয়াছুর রহমান তৎকালীন তহশিলদার ও সার্ভেয়ার কানুনগোর সরেজমিন তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে ৭২ শতক ভূমি ৯২ ধারা মোতাবেক খাস করার প্রস্তাব দেন। তার (সহকারী কমিশনার) প্রস্তাবের ভিত্তিতে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোঃ শহিদুল ইসলাম সরেজমিন তদন্ত করেন। ঘটনাস্থলে বসেই জেলা প্রশাসক মালিক বিহীন এবং তাদের কোন বৈধ ওয়ারিশ না থাকায় “খ” তফসিলভূক্ত পুরো ৭২ শতক অর্পিত সম্পত্তি ৯২ ধারার বিধান মোতাবেক ১নং খাস খতিয়ানের আওতায় নেয়ার জন্য সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) প্রস্তাব দিতে বলেন। সে অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে প্রস্তাবও দেয়া হয়। ফলে ওই সম্পত্তির একমাত্র মালিক সরকার।

এরইমধ্যে স্থানীয় চিহ্নিত কতিপয় ভূমিদস্যু ৫৪ ধারায় ১৯৬০-৬২ সালের ৩৯১২ নং কেটি নামজারী ভুয়া ডিগ্রির বলে মালিকানা দাবি করে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে ওই সম্পত্তির খাজনা দিতে গেলে ভূমি কর্মকর্তারা খাজনা গ্রহণ করেননি। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে ভূমি কর্মকর্তারা খাজনা গ্রহণের ১নং বইতে নোট দিয়ে রাখেন ৭২ শতক সম্পত্তির ওই ভূমি খাসের জন্য প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

সচেতন নগরবাসী অভিযোগ করেন, মালিক বিহীন ওই ৭২ শতক সম্পত্তি সরকারের ১নং খাস খতিয়ানে নেয়ার সকল প্রক্রিয়ার মধ্যেই আকস্মিকভাবে জেলা প্রশাসক মোঃ শহিদুল ইসলাম অন্যত্র বদলী হয়ে যায়। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সরকারী কর্মকর্তা হয়েও সরকারের সম্পত্তি রক্ষা না করে উল্টো রুপাতলী এলাকার চিহ্নিত ভূমিদস্যুদের কাছ থেকে প্রায় কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে বরিশাল সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ নাজমুল হুসাইন খান চলতি বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর ১০৫ কেটি/ ১৪-১৫ এর বলে মৃত মোহাম্মদ আলী হাওলাদারের পুত্র মোকছেদ আলী মানিক ও কাছেম আলী হাওলাদারের পুত্র সিরাজুল ইসলাম বাচ্চুর নামে রেকর্ড সংশোধনের আদেশ প্রদান করেন।

অতিসম্প্রতি বিষয়টি সর্বত্র ছড়িয়ে পরলে সরকারী কর্মকর্তার আপত্তিকর কর্মকান্ডে পুরো নগরজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। তারা (সচেতন নগরবাসী) তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জরুরি ভিত্তিতে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে ওই সরকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণসহ ভূমিদস্যুদের কবল থেকে সরকারী ভিপি তফসিলভূক্ত সম্পত্তি রক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক, দুর্নীতি দমন কমিশন ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

মিস কেস নং ১০৫ কেটি/১৪-১৫, ১৫০ ধারায় গত ১৮ সেপ্টেম্বর জাগুয়া-রায়পাশা-কড়াপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার কাছে বরিশাল সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ নাজমুল হুসাইন খানের ১৪ সেপ্টেম্বরের আদেশ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মোকছেদ আলী মানিক ও সিরাজুল ইসলাম বাচ্চুকে বাদী ও জনৈক নিজামুল হক সিকদারকে বিবাদী করে তড়িঘড়ি করে তিনি (সহকারী কমিশনার ভূমি মোঃ নাজমুল হুসাইন খান) শুনানী করেন। চলতি বছরের ২৩ জুলাই প্রথম ও ১০ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় শুনানী শেষে ১৪ সেপ্টেম্বর রায় ঘোষণা করা হয়। ঘোষিত রায়ে উল্লেখ করা হয় বাদী পক্ষ বিরোধীয় জমি বরিশাল বিজ্ঞ প্রথম যুগ্ন জেলা জজ আদালতের ৩৭/২০০২ নং দেওয়ানী মোকদ্দমার ডিগ্রিমূলে মালিকানা স্বত্ত দাবি করেন। বিবাদী নিজামুল হক সিকদার বিরোধীয় জমি ৩৪৪৯ কেটি/৬০-৬১ নং সার্টিফিকেট মোকদ্দমা মূলে দাবি করেন। বিবাদীর দাবির সুনিদিষ্ট কোন কাগজপত্র না পাওয়ায় বাদীদ্বয়ের পক্ষে রেকর্ড সংশোধনের জন্য আদেশ দেয়া হয়।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ নাজমুল হুসাইন খানের আদেশে সম্পত্তির এসএস রেকর্ডিয় মুল মালিক যতীন্দ্র নাথ ও জিতেন্দ্র নাথের কোথাও কোন অস্তিস্ত নেই। এছাড়াও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার প্রতিবেদন, ২০১৫ সালে সাবেক জেলা প্রশাসকের নির্দেশে তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ ইলিয়াছুর রহমান মালিকবিহীন হিন্দু সম্প্রদায়ের (খ) তফসিলভূক্ত অর্পিত সম্পত্তি ১নং খাস খতিয়ানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে প্রস্তাব দিলেও তা ভেস্তে যেতে বসেছে। ফলে একমাত্র সরকারের প্রাপ্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা মূল্যের ওই সম্পত্তি ভূমিদস্যুদের হাতে বেহাত হতে চলেছে।

 

১২ অক্টোবর, ২০১৭ ০৮:৩৮:৩০