কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বেহাল দশা!
জাহিদ আবেদীন বাবু, কেশবপুর (যশোর)
অ+ অ-প্রিন্ট
যশোরের কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা, স্বজনপ্রীতি, দুর্ব্যবহার, নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহসহ সময়মত ডাক্তারা অফিস না করায় এ উপজেলার ৩ লাখ মানুষের একমাত্র চিকিৎসালয়টি বেহাল দশায় পরিণত হয়েছে। ডাক্তার ও অন্যান্য কর্মকর্তা কর্মচারীদের সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত অফিস করার নিয়ম থাকলেও এ হাসপাতালে ঘটে তার উল্টো। গত মঙ্গলবার সকাল ৮টায় সাংবাদিকদের একটি দল সরেজমিনে হাসপাতালটি পরিদর্শন করলে এ বেহাল চিত্রই ফুটে ওঠে। তবে সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে টিএইচএ সকল ডাক্তারকে ফোন করে ডেকে আনার চেষ্টা করলে একমাত্র একজন ডাক্তার বাদে অন্য কোন ডাক্তার ৯টা ৫মিনিটের আগে কর্মস্থলে আসনেনি। 

জানা গেছে, স্বাস্থ্য সেবা জনগণের দোরগোড়াই পৌঁছে দিতে সরকার কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপে¬ক্সেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করে। এরই ধারাবাহিকতায় এ উপজেলার ৩ লাখ মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অতিরিক্ত আরো ৯ জন ডাক্তার যোগদান করেন। এতে রোগীদের সেবার মান আরও বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। কিন্তু হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্তার অব্যবস্থাপনা, স্বজনপ্রীতি, দূর্ব্যবহরের কারণে এ হাসপাতাল ছেড়ে গেছে একে একে ১০ জন ডাক্তার। বর্তমান হাসপাতালে ২২ জন ডাক্তারের জায়গায় আছেন ৯ জন। স্বাস্থ্য কমপে¬ক্সটি যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। কেশবপুরসহ মনিরামপুর, কলারোয়া, তালা ও ডুমুরিয়া উপজেলার হাজার হাজার রোগী চিকিৎসা সেবা নিতে আসেন বলে এ হাসপাতালের গুরুত্ব অপরিসীম। 

রোগী ও স্বজনদের অভিযোগের ভিত্তিতে মঙ্গলবার সকাল ৭টা ৪৫মি. সময় হাসপাতালটি সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়। হাসপাতলের বহি:বিভাগে কোন লাইটের ব্যবস্থা নেই। অন্ধকারের মধ্যে ৫/৬ জন রোগীকে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। সানতলা থেকে ডাক্তার দেখাতে আব্দুল খালেক, সরসকাটি থেকে ফিরোজা বেগম, ও  হাজরাকাটি থেকে এসেছেন রোস্তম মোড়ল। সবাই ডাক্তারের অপেক্ষায় বসে আছেন। কেশবপুর পৌরসভার কাউন্সিলরর শেখ আতিয়ার রহমান অভিযোগ করে বলেন, তার ভাইজি জেসমিন আরাকে গত ১৮ সেপ্টম্বর রাত ১০টায় মারাত্বক অসুস্থ অবস্থায় স্বাস্থ্য কমপে¬ক্সে ভর্তি করলেও ১৯ সেপ্টেম্বর রাত ৯টা পর্যন্ত কোন ডাক্তার তাকে চিকিৎসা সেবা দেননি। তিনি আরও অভিযোগ করেন, বন্যা পরবর্তী এলাকায় রোগ ব্যধী দেখা দিলেও সময়মত ডাক্তার না পাওয়ায় রোগীরা বেশী টাকা খরচ করে যশোর ও খুলনায় চিকিৎসা নিচ্ছে। 

বহি:বিভাগে ১০/১২টি রড লাইট থাকলেও সচল রয়েছে মাত্র ১টি তাও বন্ধ। সকাল ৯ টায় উপস্থিত হলেন হারবাল সহকারী আব্দুল হালিম। এ সময় স্বাস্থ্য কমপে¬ক্সের অন্যান্য সকল বিভাগ বন্ধ রয়েছে। জরুরী বিভাগে ঢুকতেই তার সামনে কুকুর ঘুমিয়ে থাকতে দেখা যায়। কিন্তু এর ভেতরের চিত্র উল্টো। কোন লোকজন নেই। দায়িত্বে নিয়োজিতরা পাশের একটি ঘরে টিভি, ফ্রিজ, পালঙ দিয়ে সাজিয়ে সেখানে অবস্থান করছেন। এখানে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, জরুরী বিভাগের দায়িত্বে নিয়োজিত উপসহকারী মেডিকেল অফিসার আনোয়ার হোসেন। টিএইচএ‘র সাথে সখ্যতা থাকায় ৩ দিন অফিস করেন বলে অভিযোগ। জরুরী বিভাগে কোন রোগী আসলে তিনি সহসাই ভর্তি করতে চান না। সকল ৯টায় বিভিন্ন ডাক্তারের চেম্বার পরিদর্শণকালে দেখা যায়, ডাক্তার তৌফিকুল ইসলাম অফিসে বসে রোগী দেখছেন, অন্যান্য ডা. অঞ্জলী রায়, ডা. সৌমেন বিশ্বাস, ডা. এসএম মাহবুবুর রহমান, ডা. তন্ময় বিশ্বাস, ডা. পলাশ কুমার দে, ডা. রিপন রায়, ডা. আহসানুল মিজান রুমি, ডা. বোরহান উদ্দীন চৌধুরীসহ সকল ডাক্তারের চেম্বার বন্ধ রয়েছে। ৯টা ১ মি সময় টিএইচএ তার রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি ব্যস্ত আছেন উপজেলা পরিষদের আয়াজনে জনগণের প্রাথমিক স্বাস্থ্য সচেতনতা ও হাইজিন বিষয়ক প্রশিক্ষণ নিয়ে। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে সকল ডাক্তারের কাছে মোবাইল ফোন করে স্বাস্থ্য কমপে-ক্সে ডেকে নিয়ে আসেন। এরপর যাওয়া হয় হাসপাতালের পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ডে। সেখানে এক মুমূর্ষু রোগীকে মেঝেতে বসে ভাত খেতে দেখা যাচ্ছে। সেখানে একটি বিড়ালও আছে। স্বাস্থ্য পরিদর্শক আসেন ৯টা ৬ মিনিটে। স্যানিটারী ইন্সপেক্টরের ঘর খোলা থাকলেও তিনি নাই।  

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অধিকাংশ কর্মচারীরা অভিযোগ করেছেন, অফিস চলাকালিন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এবং অন্যান্য ডাক্তার কর্মচারীরা স্বাস্থ্য কমপে¬ক্সের সামনে চায়ের দোকানে আড্ডা দিয়ে সময় পার করেন। স্বাস্থ্য কর্মকর্তা কোন কোন কর্মচারীর অতিরিক্ত সুযোগ সুবিধা দিয়ে থাকেন। তিনিই তার আস্থা ভাজন কর্মকর্তা কর্মচারীদের সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত অফিস করার সুয়োগ দিয়েছেন। এ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা কেশবপুরে যোগদানের আগে স্বাস্থ্য কমপে¬ক্সে ইতোপূর্বে এত অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ছিল না বলে কর্মকর্তা কর্মচারীদের অভিযোগ। 

এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার শেখ আবু শাহীন বলেন, সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত কর্মকর্তা কর্মচারীদের অফিস করার কথা থাকলেও নানা করণে তাদের আসতে দেরী হয়। 

 

 

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০৮:৩১