অকেজো পুলিশের সিসি ক্যামেরা, অপরাধের অভয়ারণ্য ঢাকা-না’গঞ্জ লিংক রোড
এম আর কামাল, নারায়ণগঞ্জ
অ+ অ-প্রিন্ট
ভীতি আর আতংকের এখন আরেক নাম নারায়ণগঞ্জে ৮.কি.মি. মহাসড়ক। দিনকে দিন অপরাধের অভয়ারন্যে পরিনত হয়ে উঠেছে এই ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড। গত দুই বছরে ৭ খুনের ঘটনা, বেলার নির্বাহী পরিচালকের স্বামী এবি সিদ্দিক অপহরণ ছাড়া, বোমা ফাটিয়ে চলন্ত বাস থামিয়ে মোবাইল ব্যবসায়ীকে গুলি করে টাকার ব্যাগ ছিনতাই ছাড়াও এই সড়কের ৫ কিলোমিটার এলাকায় ঘটেছে বেশ কিছু হত্যাকান্ডের ঘটনা, সড়কের পাশে পাওয়া গেছে অনেকের লাশ। অহরহ এই সড়কে অপরাধ মূলক কর্মকান্ড ঘটলেও বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসিয়ে অপরাধীদের নিয়ন্ত্রন করতে পারছেনা জেলা পুলিশ প্রশাসন। দেড় বছর যাবত অকেজো রয়েছে লিংক রোডে লাগানো জেলা পুলিশ প্রশাসনের সিসি টিভি ক্যামেরা।

জানা গেছে, ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ যাতায়াতের অন্যতম রুট হলো ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-পাগলা রুট থাকলেও উড়াল সেতুর (যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভার) কারনে লিংক রোড দিয়েই মূলত লোকজন বেশি চলাচল করে। প্রাইভেট কার ছাড়াও গণপরিবহনে এ রুটে যাত্রী সংখ্যাও বেশি। নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের দৈর্ঘ্য ৮ দশমিক ৪ কিলোমিটার। এর মধ্যে ফতুল্লার শিবু মার্কেট থেকে সাইনবোর্ডের দূরত্ব প্রায় ৫ কিলোমিটার। সড়কের এই অংশেই সবচেয়ে বেশি অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এখানকার বেশকিছু স্থান প্রায় সময়েই থাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন। আর নীরব ওই স্থানগুলোকেই মূলত টার্গেট করে ছিনতাই, অপহরণের কাজটি করে থাকে দুর্বৃত্তরা। খুন করে লাশ ডাম্পিংয়ের জন্যও সড়কের এ অংশটি বেছে নেয় অপরাধীরা। এর মধ্যে ফতুল্লার শিবু মার্কেট থেকে জালকুড়ি ও জালকুড়ি থেকে ভূইগড় ও ভূইগড় থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত লিংক রোডের বিভিন্ন স্থান অনেকটাই অরক্ষিত। পৃথক লেন থাকায় লিংক রোড দিয়ে বিভিন্ন যানবাহন বেশ দ্রুত গতিতে চলাচল করে। ফলে কোনো যান রাস্তার পাশে থেমে থাকলেও সেদিকে নজর দেয়া অন্য যানচালকের পক্ষে সাধারণত সম্ভব হয় না। লিংক রোডের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন শাখা সড়ক দিয়ে ফতুল্লা, পাগলা হয়ে যাত্রাবাড়ি এবং সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল, ঢাকেশ্বরী, আদমজী এলাকা দিয়েও বের হওয়া যায়।

এদিকে এক বছর দুই মাসের ব্যবধানে আবারো ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ভূঁইগড় এলাকায় একটি বাস থামিয়ে যাত্রীদের অস্ত্রের মুখে দুই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সাত লাখ টাকা ছিনতাই করে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা।

গত ২৭ অক্টোবর বিকেলে ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ আসার পথে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ভূইগড় মাহমুদ নগর এলাকায় মোটরসাইকেল যোগে এসে ৬ জন উৎসব পরিবহনের বাস থামিয়ে অস্ত্রের মুখে দুই স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রদীপ ঘোষ ও ফালান দাসের নিকট থাকা ৭ লাখ টাকা ছিনতাই করে নিয়ে যায়।

চলতি বছরের ২ এপ্রিল এই সড়কের পাশে মিলেছে ঢাকার দৃক গ্যালারির কর্মকর্তা ইরফানুল ইসলাম ইরফানের লাশ।

এর আগে, গত বছর ৩ আগস্ট একই পথে একই পরিবহনের একটি বাসে ছিনতাইকারীরা উঠে নুরুল ইসলাম নামের ব্যবসায়ীকে গুলি করে টাকা ছিনতাই করে নিয়ে যায়। পরে ওই ব্যবসায়ী মারা যান।

তার আগে, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী গার্মেন্ট ব্যবসায়ী আবু বকর সিদ্দিক ওরফে লিটুকে প্রকাশ্যে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ভূঁইগড়ের দেলপাড়াস্থ ভুঁইয়া ফিলিং স্টেশনের অদূর থেকে অপহরণ করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। পরে অবশ্য তাকে উদ্ধার করা হয়।

আর আলোচিত বিগত ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়ি চালক এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ ৭ জনকে র‌্যাব সদস্যরা অপহরনের পরই অপরাধের অভয়ারন্য হিসেবে চিহিৃত হয় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড। অপহরনের ৭৩ ঘন্টা পর জেলার বন্দরের শীতলক্ষা নদী থেকে ভাসমান অবস্থায় অপহৃত আইনজীবি এবং প্যানেল মেয়রসহ ৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

কিন্তু সাত খুনের ঘটনার পর ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের অপরাধ প্রবণতা রোধে জেলা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কয়েকটি স্থানে সিসি টিভি ক্যামেরা স্থাপন করলেও বর্তমানে তা অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। ঝড়ো বৃষ্টিতে একবার সিসি ক্যামেরা গুলো সাথে সংযুক্ত ফাইবার ক্যবল তাঁর ছিড়ে যাওয়ার পর তা আর সংস্কার করা হয়নি। ফলে উক্ত সড়কে বড় বড় অপরাধ মূলক কর্মকান্ড ঘটলেও প্রশাসন তড়িৎগতিতে অপরাধীদের ধরতে কোন পদক্ষেপ নিতে পারছেনা।

বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে সিসি টিভি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রনের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মো: ফারুক হোসেন জানান, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে বিকল থাকা পুলিশ প্রশাসনের সিসি টিভি ক্যামেরা গুলো দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আমাদের ফান্ড সংকট আছে। নিজস্ব ফান্ডের অর্থায়নে সিসি টিভি ক্যামেরা গুলো দ্রুত সচল করা হবে।

৩১ অক্টোবর, ২০১৬ ২১:০৫:৩০