একজন নির্লোভ কবি গল্পকার মামুনর রশিদের প্রস্থান
সৈয়দ ইকবাল
অ+ অ-প্রিন্ট
প্রিয় মামুনর রশিদ দুই দিন কোমায় স্বপ্ন দেখে শেষ পর্যন্ত  মন্ট্রিয়লের এক হাসপাতালে আইসিইউ শুয়ে-শুয়ে যেন বোর হয়ে চলে গেলেন ১৪ মার্চ। ঠিক কবিদের মত মৃত্যু। পথে হেঁটে হয় বাসায় ফির ছিলেন বা বেরিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। হার্টের ঙ্গে ব্রেনের প্রচন্ড ধাক্কায় রাস্তায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলেন। সেই যে অচেতন হলেন আর ফিরলেন না। পথচারী পুলিশ ডাকলো। এম্বুলেন্স এলো,আই সি ইউতে ঠাই পেলেন। আমি জানি তিনি ভেতরে ভেতরে হাসছেন-বলতে চাইছেন-দূর,এস হাঙ্গামার কী দরকার! যেতে হবে, যাই। কাউকে ভোগালেন না,কষ্ট দিলেন না,এমন কী কারো দয়াও নিলেন না। নিজে ও দীর্ঘ মৃত্যু যন্ত্রণা ভুগলেন না। ভূবন ভাসানো মামুনীয় হাসিকে স্টপ বলে বাইবাই করে চলে গেলেন। লোকটা এমনই ছিলেন। যেন তার কোনো লোভ নেই বিষয় সম্পত্তির মোহ নেই।আপনজনের ভালোবাসা যত্ন আদর পাওয়ার খায়েস নেই। একলা প্রায় তিন যুগ অপূর্ব জীবন কাটালেন। এত ভালো কবিতা লিখলেন সারা জীবন অথচ জোর করেও একটি কবিতার বই করতে দিলেন না। এমনকি কবি আসাদ চৌধুরী পর্যন্ত চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। আসাদ চৌধুরীর মত কবি ভীষণ পছন্দ করতেন মামুনর রশিদের কবিতা । আমার প্রতি ওনার ভালোবাসার ঋন কমাতে আমিতো কতবার যে চেষ্টা করেছি ওনার কিছু বই ঢাকার পরিচিত প্রকাশন দিয়ে প্রকাশ করার,ব্যর্থ হয়েছি বারবার। মন্ট্রিয়ল প্রবাসী শামীম ওয়াহিদ(কন্ঠশিল্পী ফেরদৌস ওয়াহীদের ভ্রাতা) কী যাদু করলেন জানিনা তিনি তার একটি গল্পের বই করতে পেরেছেন তার ‘আরিয়াল’ পাবলিশার্স থেকে। একটি মাত্র গল্প গল্পের বইটির নাম ‘সত্য মিথ্যা’ মানুষের জীবন সত্য নাকি মিথ্যা, নাকি শুধু মায়া! চাই,চাই, আমার সব চাই, চাইয়ের পিছু অনবরত ছোটাই কী জীবন।এই ছিলো তার গল্পে মূল ব্যাপার। আমি অন্তত আমার জীবনে আর কাউকে দেখিনি এমন নির্লোভ মানুষ।  ওনার দুই সন্তানকে কাছে না পাওয়ার দুঃখ থেকে যে শূণ্যতা তার হাল্কা পরশ আমি পেয়েছি যতবার তার বাসায় থেকেছি, তাই মনে হয়েছে। শেষ দিকে প্রায় এক যুগ ওনার সঙ্গে দেখা হয়নি। টরন্টো ঢাকা করতেই আমার বছর  শেষ,টরন্টো থেে মন্ট্রিয়ল যাওয়া হয়নি।  এইতো কয়েক মাস হয় ভাবলাম অনেক বছর হয়ে গেছে মামুন ভাইকে দেখতে এবার যেতেই হবে মন্ট্রিয়ল। সুযোগ ও পেয়ে গেলাম। শহীদুল ইসলাম মিন্টু গাড়িতে যাচ্ছে মন্ট্রিয়ল, সঙ্গে যাচ্ছে বন্ধু ইকবাল হাসান । হয়তো মামুন ভাইয়ের অন্তর আত্মাই আমাকে টান ছিলো,ডাক ছিলো। দুপুরেই পৌঁছে গেলম। সন্ধ্যায় এন আর বি টিভির বর্ষপূর্তির  জমজমাট অনুষ্ঠান শেষে হোটেলে ফিরতে মধ্যরাত। এরপর  মন্ট্রিয়ল বইমেলা নিয়ে রাতভোর আলাপ আলোচোনায় বসলো তৌফিক,জিয়া, বাবু,মিন্টু আর ইকবালেরা। এমন সব বিষয় এমন গুরুগম্ভীর কথাবার্তা এর মধ্যে কোন সাহসে আমি বলি - ভাই আমাকে একটু মামুনর রশিদের বাসায় নিয়ে যাবেন! ভোরে নাস্তা সেরেই আবার টরন্টো মুখো যাত্রা। আমার কাছে ফোন নম্বর পর্যন্ত নেই ওনার ।  তাহলে মন্ট্রিয়ল  এসেও দেখা হবেনা!  ঠিক তখনি ফেরেস্তার মত মুফতি ফারুক রুমে ঢুকলেন। তার সঙ্গে গাড়ি আছে, মামুন ভাইয়ের ফোন নম্বরও আছে এবং ওনার বাসাও চেনেন।  মুফতি ফারুক সব শুনে বললো - নো প্রবলেম,আমি আপনাকে নিয়ে যাবো আবার হোটেলে নামিয়ে দেবো। তবে সমস্যা হলো তিনি দিনেই তেমন একটা ফোন ধরেন না। এত রাতে কী ধরবেন। করে দেখা যাক! একবারেই ধরলেন। ফারুক ফোন আমাকে দিলেন। আমার গলা শুনে খুব খুশী মামুন ভাই। বল্লেন - ইকবাল আপনার জন্যে আমার রাত আর দিন বলে কিচ্ছু নেই, চলে আসেন এক্ষুণি। চেনা মন্ট্রিয়ল শহরও দীর্ঘদিন না থাকায় পথঘাট সব অচেনা হয়ে গেছে,আমাকে চিনতে পারছেনা। মুফতি ফারুক  যখন মামুন ভাইয়ের সামনে আমাকে এনে দাঁড়া করালন আবেগে তিনি জড়িয়ে ধরলেন, কিছুক্ষণ নিরবে বুকে চেপে রেখে কানে কানে বললেন - খুব ভালো হলো আসছেন দেখা হলো। আর কিছুটা দেরী হলে আর দেখা হতোনা। আমি নিজকে ছাড়িয় একটু জোরে বল্লাম - এত দূর থেকে এলাম মামুন ভাই আপনাকে দেখতে,আর আপনি যাওয়ার কথা বলছেন। তিনি কথা ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন-কফি পানের অভ্যাসতো ছাড়া হয়নি নিশ্চয়! তবে চিনি কী এখনো তিন চামচ চলে? আমার শেষ পর্যন্ত গল্পের একটা বই বেরিয়েছে। খুব ইচ্ছা হচ্ছিলো এককপি ইকবাল কে পাঠাই! তবে ঠিকানাতো দূরে থাক ফোন নম্বরই জানিনা। আমি বল্লাম ঢাকা ফিরলে প্রকাশক থেকে নিয়ে নেবো। আপনার কাছে হয়তো অল্পসল্প কপি আছে। ইকবালকে আমি লিখে দেবোনা,একি হয়! ওনার ঘরে আলো কম,  চারদিকেই বইয়ের ভারে কাহিল বুকসেল্ফ দেয়ালে পিঠ ঠেস দিয়ে কোনো ভাবে দাঁড়ানো। টেবিলে আমার প্রিয় ড্রাইকেক। কফি পানি রেডী করে রেখেছেন তিনি। বই লিখে দিলেন। বল্লেন রাতে থেকে যেতে অনেক কথা হবে। খুব সকালে সবাই বেরিয়ে যাবে মানুন ভাই,তাই হোটেলে এক সঙ্গে থাকা উচিত। বই লিখে দিলেন,আবার জড়িয়ে ধরে বিদায় দিলেন। এলিভেটরের দিকে পা বাড়াতে গিয়ে আবার ঘুরে তাকালাম। খুব শুকিয়ে গেছেন তিনি। চোখ দু’টো ঠিকই আগের মত জ্বলজ্বল করছে। আমি ফিরে গিয়ে ওনার দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বল্লাম মামুন ভাই আপনার সঙ্গে একটা ছবি তুলি। মুফতি ফারুক নিজর ফোন ক্যামেরায় তুলে পরে আমাকে পাঠিয়ে ছিলো সেই ছবিটি।হয়তো এটাই ওনার শেষ ছবি তোলা। এবার পেছনের কথা বলি। মামুনর রশিদ বৃদ্ধকালেও সুদর্শন এবং আলোময় পুরুষ ছিলেন। তাহলে যৌবনে কেমন ছিলেন বুঝেতেই পারছেন। তবে জীবনের সঙ্গে বুক চিতিয়ে যুদ্ধে দাঁড়াতে চাইতেন না।পালিয়ে বাঁচতে চাইতেন। আমি ও আমার চট্টগ্রামের কবি বন্ধু স্বপন দত্ত প্রায় ওনার বাসায় যেতাম। তিনি তখন করাচি টরাচি ঘুরে এসে চট্টগ্রামে থিতু হয়েছেন। দেশ স্বধীনের আগে কথা। চট্টগ্রামে মানুষ জন তখন তত ফুলে ফেঁপে ওঠেনি। আগাবাদ মেইন রোড ছেড়ে একটা গলি ধরে ভেতরে ঢুকলে ছোট মাঠের এক প্রান্তে টিনের ছাউনী বাঁশের বেড়া দেয়া মেস বাড়ি। মামুন ভাই বেশ বড় এক রুম নিয়ে একা থাকতেন। অন্যান্য রুমে দুই কিংবা তিনজন মানুষ থাকতো। মামুন ভাইয়ের তখনই  গল্প চিত্রকাশ,জোনাকী পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। কবিতা আজাদ পত্রিকায় বেরিয়েছে। আমি ও স্বপন ভালো করে কিছু শুরুই করিনি তখন । মূলত খুব ঝামেলায় ছিলাম যেহেতু কিভেবে লেখালিখি করতে হয় সেটাই রপ্ত করতে পারছিলাম না। ওনার কাছে ঘনঘন যাওয়া মানে একটা দিশা পাওয়া। তিনি তখনো কী ভালো বাঁশী বাঁজাতেন। বাশেঁ নানা রকম বাশীঁ ছুলিয়ে রাখতেন দেয়ালে ঠিক মন্ট্রিয়লের বাসার মতই। গল্প কবিতা লেখার টেকনিক ভাব বুঝতে গিয়ে ওনার বাঁশী শুনে মুগ্ধ হয়ে বাড়ি ফিরে যেতাম। আবার কোনো দিন লেখা নিয়ে ও আলাপ হতো। মুক্তিযুদ্ধের পর আর ওনাকে পাইনি। কোথায় যে গেলেন বলেও যাননি।  সত্বর দশকে শেষ দিকে ঢাকার মহাখালী মোড়ে ওনাকে দেখলাম আকাশের দিকে তাকিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। আমি তখন ঢাকায় বিটপী এড এজেন্সীতে দুই-তিন বছর কাজ করছি। টুকটাক মুক্তধারার বইয়ের প্রচছদ করছি। লেখার কায়দা নিজের মত বুঝে গিয়েছি।গল্প লিখি পত্র পত্রকায় দিলে ছাপাও হচ্ছে। একটি কিশোর উপন্যাস ‘কুশল আর মৃত্যুবুড়ো’ শিশু একাডেমিতে মনোনিত হয়েছে বইয়ের জন্য,সহসা বেরিয়ে যাবে। আমাকে পেয়ে আবার তিনি খুব খুশী। মামুন ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হতে লাগলো। আমাকে বাসায় নেয়ার তেমন আগ্রহ দেখালেন না। আমারও তার বাসায় যাওয়ার তেমন ইচছা নেই। আবহাওয়া দপ্তরে তিনি কাজ করেন। কথাবার্তায় বুঝেছি তিনি বিয়ে করেছেন। দেখা হয় রেস্টুরেন্টে বসে চা সিঙ্গারা খাই। কথা বলি তারপর যে যেদিকে থাকি চলে যাই। আমি তখন মগবাজার নয়াটোলায় একা এক রুমের ঘরে থাকি নেকটা মামুন ভাইয়ের চট্টগ্রামের মত। রেড ইন্ডিয়ান মুখের চামড়া কুচকানো হাল্কা কুঁজো এক বুড়ি আমার খাওয়া দাওয়া বাজার রান্না বান্নায় নিয়োজিত। ঘরে ফ্রিজট্রিজ নেই দুপুরে রান্না করে ঢেকে রেখে যান রাতের খাবার। প্রচ্ছদ ডিজাইনের বা অন্য কাজে কিছু টাকা পেলে মগবাজার মোড়ে ‘ক্যাফে ডি তাজে’ মুরগী বিরীয়ানী হাফ প্লেট খেয়ে বাসায় ফিরি। বুড়িমা সকলে খাওয়া ঢাকা রয়ে গেছে দেখলে রেগে আগুন। মামুন ভাইকে আনতে চাই আমর বাসায় কিংবা ৩৫ নম্বর তোপখানা রোডে বিটপী অফিসে, আসি আসি করেন কিন্তু আসেন না। আমার ও কাজ কাম লেখক শিল্পী বন্ধু হয়েছে। বন্ধু ইমদাদুল হক মিলন আর আমি পাল্লা দিয়ে লিখি তখন । মামুন ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ কমতে লাগলো। এক সময় মনে হলো প্রায় চার মাস হয়ে গেছে মামুন ভাইয়ের খবর নেই। ভাবলাম আছেন হতো ব্যাস্ত,সময় সুযোগ পেলে ঠিকই যোগাযোগ করবেন। ছয় মাস পেরুলো,ওনার বাসা চিনিনা। একদিন ওনার অফিসে গিয়ে খোঁজ নিলাম। চাকরী ছেড়ে কোথায় যে গেছেন কেউ জানেনা। তখনতো আর সেল ফোন,ইমেল বা ফেসবুক ছিলোনা। হারিয়ে গেলে কেউ যোগাযোগের সূত্র পাওয়া  অসম্ভব ছিলো প্রায়।একজন নির্লোভ কবি গল্পকার মামুনর রশিদের প্রস্থান
আবার হারালাম মামুন ভাইকে।  নব্বই দশকের  শুরুর কয়েকটা বছর কেটেছে মাত্র স্বপরিবারে কানাডার ইমিগ্রেশন নিয়ে মন্ট্রিয়লে এসে নেমেছি। আপন শালা এবং শালী থাকে মন্ট্রিয়লে, শুধু থাকা বলা ঠিক হলোনা দুই জনই বিয়ে করেছে ফ্রেঞ্চ কানাডিয়ান। ছেলে মেয়ে সহ কানাডার মূলস্রোতে মিশে গেছে,বাঙালীপনা খুবই খুব কম তাদের মধ্যে। আর্থিক ও বিষয় সম্পত্তিতে অনেক এগিয়ে তারা। এই বয়সে আমি বিটপীর সিনিয়র আর্ট ডিরেক্টর ও আমার স্ত্রী বিশ্ব ব্যাংকে কাজ নিয়ে ভালোই ছিলাম ঢাকায়। আমি যে নিজে খাপ খাওয়াতে পারবো না আসার আগেই জানতাম। মন্ট্রিয়ল শহর থেকে একটু দূরে বেশ নিরিবিলিতে শালীর বাড়িতে আমরা থাকি। মাস খানেকের মধ্যে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম আমি। পুরোটাই আমার দোষ,এতো ভালো থাকা,খাওয়া, গাড়িতে ঘোরা। তবু সারাক্ষণ ছটফট করি। আমিতো তেমন ডিসিপ্লিন মানুষ নই। না খাওয়ার ঠিক আছে,না ঘুমের সময় আছে। তারপর বাঙালী আড্ডায় ঘন্টার পর ঘন্টা  নষ্ট করা পুরোনো অভ্যাস।  এক সূত্রে এক বাঙালী জানালেন মন্ট্রিয়লের বাঙলা পাড়া দুইটি প্লামনডন মেট্রোর আসে পাসে  এবং পার্ক মেট্রোর আসেপাশে। একজন ফোন নম্বর দিলো কানাডার প্রথম বাংলা সাপ্তাহিক ‘বাংলা বার্তা’ পত্রিকার। ফোন করে সাবওয়েতে করে পার্ক মেট্রো এসে রু ডুরেঁসে বাংলা বার্তা অফিসে এলাম। আমার জন্যে এত বড় চমক অপেক্ষা করছে ভাবিনি। প্রথম চমক গত পনেরো দিন আগে বেরুনো বাংলা বার্তায় ব্যাক পেইজে ছোট্ট নিউজ ‘শিল্পী সৈয়দ ইকবাল এসেছেন মন্ট্রিয়লে,স্বপরিবারে বসবাস করবেন।‘ দ্বিতীয় চমক পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক হচ্ছেন আমর হারানো সেই মামুন ভাই,মামুনর রশিদ। চট্টগ্রামে হারিয়ে ঢাকায় পাওয়া,ঢাকায় হারিয়ে তাকে একেবারে সাত সমুদ্র পার হয়ে কানাডার মন্ট্রিয়ল শহরে আবার পাওয়া। এক বড় চমকইতো!  ইতিমধ্যে স্ত্রী দুই সন্তান সঙ্গে নিয়ে তাকে ছেড়ে গেছেন। রু ফ্রেঞ্চে বলে রোডকে। রু ডুরেস্যাঁতে তার তিন রুমের বাসা। সঙ্গে বাংলা বার্তা পত্রিকাকে ঘিরে একদল স্বপ্নবাজ তরুণ ও তাদের বউয়েরা মামুন ভাইয়ের জন্যে নিবেদিত প্রাণ। সাইফুল ওয়াদুদ হেলাল কাজ শুরু করেছে সিনেমা এডিটিং নিয়ে ছোট ছোট টুকরো ফিলম বানান,বাংলা বার্তায় তার রম্য রচনা সবাই খুব  পছন্দ করছে। তার বউ হলো কাজী মীরা। আমার ছোটবেলার বন্ধু আজকের খ্যাতিমান কবি সাংবাদিক কাজী রফিকের ছট বোন। চটগ্রাম রেল কলোনী রফিকে বাসায় ম্যারথন সাহিত্য আড্ডায় কাঁপা কাঁপা হাতে চায়ের কাপ নিয়ে এগিয়ে আসতো এই ছোট্ট মীরা। হেলালের নিজের স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়ার মূল শক্তি ছিলো মীরা। সুলতানা শিরীন সাজী দারুণ সব কবিতা লেখে মামুন ভাইকে দেখায়।সাজীর বর মিঠু স্টলারে সঙ্গ নেয়া সন্তান রাসিক। প্রায় লম্বায় ছয় ফুট দীর্ঘ সহজ সরল চিত্রকর হবার স্বপনে বিভোর তুহীন আসল নাম রবি খান। মোজা ফ্যাক্টরীর দায়িত্বশীল কাজ করা কলাবাগান ফার্স্ট লেইনের মাসুদ। যার সুবাদে কারো পায়ের মোজা ডলার খরচা করে কখনো কেনার প্রশ্নই উঠতোনা। চট্টগ্রামের ডক্টর ইউনুসের জোবরা গ্রামের ফর্সা দিদার। মামুনর রশিদ আর কানাডার প্রথম বাংলা ছাপা সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘বাংলা বার্তা’কে যিরে এই সব তরুণরা উদ্দীপ্ত নিজ নিজ স্বপ্ন পূরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তখন । মামুন ভাই আন্তরিক ভাবে বল্লেন - ইকবাল চলে আসেন আমার কাছে। একাইতো থাকি। দুই রুম খালি পড়ে আছে। আমি যা খাই ভাগ করে খাবো দুইজন। আমাকে কখনো রান্নাবান্না করতে দেননি।নিজেই রান্না করে খাইয়েছেন। মাঝেমধ্যে শীত কালে অঝোর তুষার পাতে বাড়ি থেকে বেরুনো মুস্কিল। বাজার ঘরে যা ছিলো সব শেষ। মামুন ভাই গরম ভাত রান্না করে তাতে চক্রা আকারে ঘি ঢেলে অনবরত  ডাকতেই থাকতেন - আসেন ইকবাল ভাত ঠান্ডা হয়ে গেলে আর মজা পাবেননা। আমি মগ্ন থাকতাম ছবি আঁকতে। আসছি মামুন ভাই বলছি ঠিকই কিন্তু উঠে যাচ্ছিনা। এক সময় মামুন ভাই প্লেট নিয়ে এসে হাতে ধরিয়ে বলতেন আগে খাওয়া দাওয়া তারপর সবকিছু। মামুন ভাইয়ের এই রু ডুরিসেঁ বাসায় বসেই সব ছবি এঁকে ১৯৯৫ সালে লাভাল শেরাটনে ৩০টি ছবির ‘ঘুরে দাঁড়াও বাংলাদেশ’ প্রদর্শনী করি। মাঝে মাঝে রান্নার মুড না থাকলেও বলতেন - ইকবাল নেন গায়ে ওভারকোট চাপান। খাদ্যের সম্ধানে বের হই। সাজী বা মীরা যারই বাড়ি যাই বলার আগেই টেবিলে সাজিয়ে দিতো রকমারি খাওয়ার। তখন হেলাল মীরার প্রথম কন্যা গল্প খুব ছোট্ট। তাকে কোলে নিয়ে মীরা এমন মজার পায়েস বানাতো। যার স্বাদ এখনো যেন মগজে টের পাই। আজ তুহীন, রবি খান নেই।  শিল্পী হিসেবে ছবি এঁকে ভালো নাম করছিল দেশে,ছবির হাটে তার ভক্তরা শিল্পী বন্ধুরা তাকে যে ভাবে ঘিরে রাখতো,তার কাজের প্রশংসা  করতো তা দূর থেকে দেখে মনে হতো স্বপ্ন তার পূরণ হয়েছ।এবার শুধু আরো বড় শিল্পী হয়ে ওঠার পালা। ঠিক তার জীবনের এই সুন্দর সময় ক্যানসার তাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেলো। হেলাল সিনেমা ডকোমেন্টারী ফিলম বানিয়ে কানাডা ও দেশে নাম কুড়িয়েছে।মন্ট্রিয়ল ইন্টারন্যাশনাল ফিলম ফেস্টিভ্যালে তার ‘কালার অব ফেইথ’ মনোনিত হয়ে প্রদর্শিত হয়েছে। সুলতানা শিরীন সাজীর এখন একজন ভালো কবি। কবিতার বইয়ের পর বই বেরুচ্ছে। সাজীর সন্তান রাসিক হেলালের সন্তান গল্প এবং গ্রন্থ পিত্রহীন তুহীনের(রবি খান) ছেলে বেড়ে উঠেছে। শিক্ষায় দীক্ষায়  নামে দামে বড় হবে এরা সবাই। বাবা মায়ের কাছে বার বার শুনবে একজন নির্লোভ মামুন মানুষের কথা। যেহেতু বাবা মা এ জীবনে ভুলবেনা এই মানুষটির কথা। যিনি সারা জীবন সবাইকে শুধু ভালোবাসা দিয়ে গেলেন বিন্দু মাত্র ফেরত নিলেননা।

 

১৯ মার্চ, ২০১৯ ২৩:৫৪:৫৪