টরন্টোর বুকে স্থায়ী শহীদ মিনার এবং আমাদের বিভাজননীতি
শিউলী জাহান
অ+ অ-প্রিন্ট
প্রায় এক দশকের জল্পনা-কল্পনা, আলাপন ও পরিকল্পনা শেষে উদ্যোক্তাদের মেধা, অর্থ ও শ্রমের বিনিময়ে অবশেষে গত ২ অক্টোবর ২০১৭ তারিখে ভাষা শহীদদের স্মরণে এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নিমিত্তে টরন্টোতে একটি স্থায়ী শহীদ মিনার স্থাপনের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে টরন্টো সিটি কাউন্সিল।  শহীদ মিনারটি নির্মাণের জন্য স্থান  নির্ধারিত হয়েছে টরন্টোর বাঙালি অভিবাসীদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল ড্যানফোর্থে র  টেইলর ক্রীক পার্ক।  সিটি অব টরন্টোর পার্কস, ফরেস্ট্রি এ্যান্ড রিক্রিয়েশন ডিপার্টমেন্ট প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণ শেষে গত ৬ সেপ্টেম্বর মিনার স্থাপনার জন্য নির্বাচিত স্থানটি দিতে সম্মত হয়। আর এই উদ্যোগের পেছনে ‘অর্গানাইজেশন ফর টরন্টো ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাংঙ্গুয়েজ ডে মনুমেন্ট ইনক(OTIMLDM)’ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।

টরন্টো তথা কানাডার প্রতিটি বাঙালির কাছে নিঃসন্দেহে একটি উদ্দীপনাময় সুখবর। কেননা, দেশের বাইরে বাংলাদেশি যেখানে যায় সাথে থাকে একটুকরো বাংলাদেশ এবং মাতৃভাষার গর্ব।  যে আবেগ ও নিজ ভাষার অধিকারের দাবিতে ১৯৫২ সালে  অর্জিত হয়েছে বাংলাভাষা, সেই একই আবেগ ও দেশপ্রেম দিয়ে ১৯৭১-এ আমরা পেয়েছি স্বাধীন  বাংলাদেশ। এই অর্জনকে আমরা সর্বত্রই বুকে ধারণ করে চলি।  যেখনেই আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের আয়োজন,  আমরা আনন্দিত হই, অংশগ্রহণ ও সমর্থনের মাধ্যমে এই উদ্যোগকে  উৎসাহিত করি। প্রবাসের ব্যস্ততম জীবন যাপনে ইচ্ছে থাকলেও তার বাস্তবায়ন সবার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই যিনি ও যারা উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে যান অন্যরা তাকে সহযোগিতা ও সমর্থন দেন। আমরা তাদের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই প্রাণের তাগিদে। সেখানে অন্তর্নিহিত ব্যক্তি কিংবা দলীয়  স্বার্থ মনোবৃত্তিকে হয়তো কিছুটা উপেক্ষা করেই।

টরন্টোর ড্যানফোর্থ মূলত বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা। এখানে স্থাপিত অস্থায়ী শহীদ মিনারটি প্রথম যখন দেখি, আপ্লুত হয়ে ভেবেছি - আমরা পারি! সত্যিই আমরা পারি! তখনই মনে হয়েছিল জনবহুল এই রাস্তার পাশে না হয়ে যদি একটি স্থায়ী স্থাপনা করা যেত - নির্ধারিত একটি শহীদ মিনারেই টরন্টোর সকল বাঙালি এসে তাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করবে। ভাষা ও ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মান ও স্মরণে আমরা একই আবেগের তলায় এসে নতজানু হবো। সেই সাথে আগ্রহী অন্য ভাষাভাষী অধিবাসীরাও তাদের নিজ ভাষার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে আসবে।টরন্টোর বুকে স্থায়ী শহীদ মিনার এবং আমাদের বিভাজননীতি

ড্যানফোর্থ প্রধান সড়কের পাশে এক টুকরো খালি জায়গায় এই অস্থায়ী শহীদ মিনারটি স্থাপনের পেছনে যাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ঘাম নিয়মিত ঝরে তিনি ‘সার্বজনীন ২১শে উদযাপন কমিটি’র প্রধান সৈয়দ সামসুল আলম এবং বাংলাদেশি ঐতিহ্যবাহী খাবারের পরিবেশক ঘরোয়া রেস্টুরেন্টের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর ভাষ্যমতে ১৯৯৬ সালে প্রথম এই উদ্যোগটি নেয়া হয়। তিনি বলেন, “আমাদের কাজ শহীদ মিনার বানিয়ে দেওয়া। অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই। এখন লোকজন আসবেন, ফুল দিবেন। কে বানালো, কী বানালো তা নিয়ে আমরা চিন্তা করি না।”প্রতিবছর এই অস্থায়ী শহীদ মিনারটি তিনি স্থাপন করে আসছেন। তাঁর এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে এখানে প্রতিবছর ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করার জন্য বাংলাভাষাভাষী ছাড়াও অন্য ভাষার আগ্রহী অধিবাসীগণও আসেন।

এই ধারাবাহিকতায় মূলত একটি স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।  বিশেষত গত বছর অস্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণকে কেন্দ্র করে টরন্টোর বাঙালি কম্যুনিটির মধ্যে বিভক্তির রেখা সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমান অস্থায়ী শহীদ মিনারের মাত্র ১০০ গজ দূরে অন্য আরেকটি শহীদ মিনার তৈরি করা হলে বিষয়টি বাঙালি ছাড়াও এলাকার অন্যভাষাভাষীদের মধ্যেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। যা আমাদের জাতি ও ভাষার জন্য একটি লজ্জাষ্কর পরিস্থিতি। একটি স্থায়ী শহীদ মিনার স্থাপিত হলে এই দলীয় কোন্দলের অবসান হতে পারে বলে আমি মনে করি এবং সেটাই বাঞ্চনীয়। 

বহুভাষী ও বহুজাতিক সংস্কৃতির মোজাইক দেশ কানাডা। কানাডীয় সরকার সংবিধানের নীতিমালা অনুযায়ী এই বহুজাতিক সংস্কৃতির মর্যাদা রক্ষা ও চর্চায় সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করে আসছে। ১৯৯৯ সালের নভেম্বরে  জাতিসংঘ ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেবার পর আমাদের মাতৃভাষা দিবসটি শুধু আমাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এর আবেগ ও আবেদন ছড়িয়ে পড়েছে অন্যভাষার অধিবাসীদের মাঝেও। এই বিবেচনায়ও টরন্টোর সিটি কাউন্সিল স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণের প্রস্তাবনার  বিষয়টিকে বৃহত্তর পরিসরে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে সার্বিক সহযোগিতা প্রদানে সম্মত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, অত্র এলাকার (বিচেস – ইস্ট ইয়র্ক, ওয়ার্ড -৩১) সিটি কাউন্সিলর জ্যানেট ডেভিস এই স্থায়ী শহীদ মিনারটি স্থাপনের ব্যাপারে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে আসছেন ‘অর্গানাইজেশন ফর টরন্টো ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাংঙ্গুয়েজ ডে মনুমেন্ট ইনক (OTIMLDM) এর সাথে। বাংলাদেশের মাতৃভাষা দিবস ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠার পেছনেও ছিল কানাডার ভ্যাঙ্কুভার প্রবাসী রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালামের নিরলস প্রয়াস। বাংলা ভাষা ও সংস্কতির চর্চা ও মর্যাদার প্রসারে কানাডার বাঙালি অভিবাসীরা প্রশংসনীয় পদক্ষেপ রেখে আসছেন। 

সব কালজয়ী সাফল্যের পেছনে যেমন থাকে ধাপে ধাপে পদক্ষেপ। অনেক প্রচেষ্টার মিলিত ফসল। তেমনি এই টরন্টোর বুকে স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণের এই সাফল্যের পেছনেও আছে অনেক মহতী মানুষের প্রস্তাবনা, উদ্যোগ, এবং ধাপে ধাপে এগিয়ে নেয়া। কারো অবদানকেই এখানে খাটো করে দেখবার অবকাশ নেই। কেননা, সবার উৎসাহ ও আগ্রহের সম্মিলিত ফসল আজকের স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণের চূড়ান্ত   অনুমোদন। বিভিন্ন তথ্যসূত্র থেকে জানা যায়, স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সর্ব প্রথম ২০০৮ সালে একটা সভা অনুষ্ঠিত হয় সাংবাদিক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফোরাম কানাডার অন্যতম সংগঠক জনাব মোহাম্মদ আলী বুখারীর উদ্যোগে। তিনি ‘আইএমএলডিএম ইনক’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সভার নেতৃত্বে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফোরামের তৎকালীন সভাপতি জনাব গোলাম মোহাম্মদ এবং লেখক হাসান মাহমুদ।পরবর্তীতে এই সংগঠনটির কাজের অগ্রগতি কিংবা ধারাবাহিক পদক্ষেপ অনিশ্চিত হলে এই প্রস্তাবনাকে বাস্তব রূপদানে সিটি অফ টরন্টোর বিভিন্ন বিভাগ এবং কর্মকর্তাদের সাথে সমন্বয় করে আজিম দেওয়ানের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ ডে মনুমেন্ট বোর্ড। তথ্যসূত্র থেকে জানা যায়,  যেদিন স্থায়ী শহীদ মিনারটি নির্মাণের কাজ সমাপ্ত হবে এবং টরন্টো সিটি কর্পোরেশন এর তত্বাবধানের দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করবে সেদিন এই সংগঠনটির বিলুপ্তি ঘোষিত হবে।  

অর্গানাইজেশন ফর টরন্টো ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাংঙ্গুয়েজ ডে মনুমেন্ট ইনক এবং টরন্টো সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে স্থায়ী শহীদ মিনারটি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় আয়োজিত বিভিন্ন সভায় অংশ নিয়েছিলেন সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট আজিম দেওয়ান, সাধারণ সম্পাদক ফুয়াদ চৌধুরী, ডিজাইনার ইঞ্জিনিয়ার মনির বাবু, মীর্জা শহীদুর রহমান, সাংস্কৃতিক কর্মী ম্যাক আজাদ, রিজওয়ান রহমান এবং আরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও সিটির পক্ষে সিটি কাউন্সিলর জ্যানেট ডেভিস, পার্ক পার্টনারশিপ ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার রব রিচার্ডসন, পার্কনীতি ও প্রকল্প উপদেষ্টা মেগান প্রাইজ, সাংস্কৃতিক বিষয়ক ম্যানেজার স্যালি হান, শিল্পকলা বিষয়ক কর্মকর্তা ক্লারা হাতগুটাই, এবং বন বিষয়ক পরিকল্পনাকারী ক্রিস্টিন ওল্ডস্নাল প্রমূখ। এই সভায় শহীদ মিনার নির্মাণের প্রস্তাবনা ও বাস্তবাযন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচনার অন্তর্ভুক্ত ছিল - শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য অর্থ সংগ্রহ; ব্যবহৃত উপাদান; সময় সীমা নির্ধারণ; ভূমি জরিপ ও পরীক্ষার রিপোর্ট এবং নকশা জমা দেয়া জাতীয় বিষয়গুলো। বোর্ডের পক্ষ থেকে এর সদস্যবৃন্দ সিটি কতৃপক্ষকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। সূত্রমতে, এই শহীদ মিনারটি স্থাপন করতে প্রায় ২৫০,০০০ ডলার ব্যয় হবে।  টরন্টোর বুকে স্থায়ী শহীদ মিনার এবং আমাদের বিভাজননীতি

কিন্তু এখানেও এতো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাস্তবায়নের দোরগোড়াতে এসে বিভাজনের কালো অন্ধকার পথ রোধ করে দাঁড়িয়েছে।  সংগঠনটির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে মত দ্বৈততা ও নৈতিক বোধের বৈপরীত্যে ভেঙে যাচ্ছে ঐক্যের বন্ধন। প্রধান উদ্যোক্তা দেওয়ান আজিমের নেতৃত্বে একটি অংশ এবং ম্যাক আজাদের নেতৃত্বে আরেকটি অংশ। যে জাতি অর্জন করেছে নিজ  মাতৃভাষা, যে জাতি অনেক রক্তের বিনিময়ে অর্জন করেছে একটি স্বাধীন দেশ, সে জাতির এই অনৈক্য ও মতভেদ দুঃখজনক বিশেষত কানাডার প্রাদেশিয় সরকারের প্রতিনিধিদের কাছে। এই আচরণে যখন তারা ক্ষুদ্ধ ও বিরক্তি  প্রকাশ করে, দোষারোপ করে আমাদের ব্যক্তিস্বার্থকে - লজ্জিত হই ভীষণ।

যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র,  জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্সে স্থায়ী শহীদ মিনার বহু পূর্বেই স্থাপিত হয়েছে। এক্ষেত্রে পিছিয়ে গেছে কানাডার বাঙালিদের উদ্যোগের সফলতা। তাই, অর্গানাইজেশন ফর টরন্টো ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাংঙ্গুয়েজ ডে মনুমেন্ট ইনক(OTIMLDM) এবং সকল উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান, দেশ ও জাতির স্বার্থে সকল বিভাজনের অবসান ঘটিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসুন।কানাডা প্রবাসী বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের লালিত আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন ঘটুক। পারস্পরিক সহযোগিতায় টরন্টোর বুকে স্থায়ী হোক আমাদের গর্ব, অমর ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা শহীদদের স্মরণে একটি শহীদ মিনার।

ছবি: অর্গানাইজেশন ফর টরন্টো ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাংঙ্গুয়েজ ডে মনুমেন্ট ইনক

 

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ২৩:০৯:১০