বইপড়া প্রকল্প: বিএলআরসি
মানজু মান আরা
অ+ অ-প্রিন্ট
মঞ্চে উপবিষ্ট অতিথিদের সাথে বাংলা সাহিত্যের ওপর কুইজ প্রতিযোগিতার পুরস্কারবিজয়ী ও অনুষ্ঠান পরিচালকেরা। ছবি: জাভেদ ইকবাল
‘বই পড়ে কেউ কখনও দেউলিয়া হয়ে যায় না।’ 

আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বই পড়ায় উৎসাহী করা এবং বাংলা সাহিত্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার স্বপ্ন নিয়ে এক প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে টরন্টোর বেঙ্গলি লিটারারি রিসোর্স সেন্টার (বিএলআরসি)। গত ১৮ নভেম্বর তারিখে বিকেল ৪টায় শহরের আলবার্ট ক্যম্পবেল লাইব্রেরি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় ইংরেজি ভাষায় বাংলা সাহিত্যের বইপড়া প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। এটি মূলতঃ সবার জন্য উন্মুক্ত এক বছরের প্রকল্প। কিন্তু ১৪ থেকে ৩০ বছর বয়সীরা এই প্রকল্পে একটি বিশেষ প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করতে পারবে। তারা সারা বছর ধরে বই পড়ার পর এর ওপর একটি প্রতিবেদন লিখে জমা দেবে। যার মধ্য থেকে ১০ জনের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে এবং ১ম, ২য় ও ৩য় স্থান অধিকারকারীকে পুরস্কৃত করা হবে। বইয়ের প্রতিবেদন জমা দিতে হবে ২০১৭ সালের আগস্টে। 

একই ভ্যেনু অর্থাৎ আলবার্ট ক্যাম্পবেল লাইব্রেরি মিলনায়তনে ডিসেম্বর ২০১৭ থেকে আগস্ট ২০১৮ পর্যন্ত মাসের প্রথম শনিবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত চলবে বই নেওয়া এবং দেওয়ার এ কার্যক্রম। এছাড়া ওই সব শনিবার সকাল ১১টায় আয়োজন করা হবে কানাডিয়ান লেখকদের সাথে সাহিত্য-আড্ডা, যা কানাডা এবং বাংলাদেশের সাহিত্যের মধ্যে এক বিশেষ সেতু বন্ধন তৈরি করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা যায়। আগামী বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এ প্রকল্পের সমাপ্তি ঘোষণা করা হবে। 

এ প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়োজিত আছে একদল উচ্ছ্বল তরুণদল।  সংগঠনের নির্বাহী পরচিালক সুব্রত কুমার রয়েছেন বইপড়া প্রকল্পের কর্ণধার হিসেবে। পরিচালকের দায়িত্বভার বর্তেছে মুক্তচিন্তক আকবর হোসেনের ওপর। সমন্বয়কারীর ভূমিকায় দায়িত্ব পালন করছেন তাসনিমা খান। আরও যে তরুণেরা রয়েছে তারা হচ্ছে: সূচনা দাস বাঁধন, শামা সালমা পূর্বা, অদিতি জহির, ফৌজিয়া, সুইটি রায়, মাসুদা জাবিন, মো. আজওয়াদ কবীর, অনন্যা ঐশ^র্য রাফা, হাসিব করিম, অনিন্দ দাস এবং মেরিলিন পা-ে। এছাড়াও আরও অনেকে আছেন যারা প্রকল্পটিকে বিশেষভাবে সহযোগিতা করেছেন।

বই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য:

ক্স প্রবাসী বাঙ্গালী তরুণদের বই পড়া এবং বাংলা সাহিত্য সম্বন্ধে উৎসাহিত করা

ক্স সমাজকে একদল বইপড়–য়া তরুণ উপহার দেওয়া

ক্স টরন্টোর অবাঙ্গালী কিছু পাঠককে বাংলা সাহিত্য এবং লেখকদের সম্পর্কে অবহিত করণ

 

যাই হোক, এবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ফিরে আসি। অবিরল বৃষ্টির ধারায় ¯œাত ছিল টরন্টো সেদিন। কিন্তু এত দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়াও মানুষকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। হলটি ছিল দর্শকে পরিপূর্ণ। তরুণদের পাশাপাশি সকল বয়সী দর্শকদের এ উদ্বোধনী পর্বে সমাবেশ ঘটে। বই পড়া বিষয়ে সবারই চোখে মুখে ছিল উৎসাহ আর উদ্দীপনা। বিশেষ করে, বাংলদেশীদের মধ্যে যারা বাংলা পড়তে পারে না তাদের জন্য এটি বাংলা সাহিত্যের উপর জ্ঞান আহরণের একটি বিশেষ উন্মোচিত দ্বার। 

অনুষ্ঠান শুরু হয় যথারীতি সঠিক সময়ে। বিএলআরসি’র কর্ণধার সুব্রত কুমার দাসের স্বল্প পরিসরের উদ্বোধনী বক্তব্যের মাধ্যমে এ প্রকল্পের অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর তাসমিনা খান প্রকল্পটির সংক্ষিপ্ত চিত্র এবং দিকনির্দেশনা তুলে ধরে। এরপর স্বেচ্ছাসেবকদের মঞ্চে একে একে ডেকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।

এরপর পরই শুরু হয় চমৎকার একটি উন্মক্ত অনলাইন কুইজ পর্ব। বাংলা সাহিত্য নিয়ে এই কুইজ পর্বটি পরিচালনা করে এ প্রজন্মের একজন উজ্জ্বল তরুণ এবং বইপড়া প্রকল্পের বিশেষ সদস্য হাসিব করিম। হাসিব খুবই চমৎকারভাবে এ পর্বটি পরিচালনা করে।  অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রথম ১০ জনকে বই পুরস্কার প্রদান করা হয়। কুইজগুলো সাজানো হয়েছে বাংলা সাহিত্যের ওপর কিছু প্রশ্ন দিয়ে। উপস্থিত দর্শকদের সকলে টানটান উত্তেজনার মধ্যে এ পর্বটি উপভোগ করেন। 

কুইজপর্ব শেষে মঞ্চ আলোকিত করে উপবেশন করেন লেখক জনাব আকবর হোসেন, বিশিষ্ট সমাজসেবক ড. দেবাশিস মৃধা, কানাডার লিটারারি  ট্রান্সস্লেটরস এসোসিয়েশনের সভাপতি ও অনুবাদক বিয়াট্রিস হাউসনার, টরন্টো সিটি কাউন্সিলর জেনেট ডেভিস, রায়ারসন বিশ^বিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. জনম মুখার্জী ও টরন্টো স্কুল বোর্ডের ট্রাস্টি পার্থি ক্যান্ডেভাল। তারা একে একে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন এবং  উদ্যোগটির ভূয়সী প্রশংসা করেন। 

মিশিগান থেকে আগত চিকিৎসক ও দার্শনিক ড. দেবাশিষ মৃধা, এমডি বলেন এটা একটা বিশাল উদ্যোগ, যেখানে বিএলআরসি এতো বিজ্ঞ মানুষের মিলন মেলার সমাগম ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। তিনি আয়োজক এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ দেন এবং এর সাথে যুক্ত থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। উল্লেখ করা যেতে পারে বছরব্যাপী এই বইপড়া প্রকল্পের অর্থায়ন করছেন বাংলাপ্রেমী আমেরিকাবাসী এই সমাজসেবক। 

জেনেট ডেভিস অত্যন্ত আশাবাদী ভাষায় বাংলা সাহিত্যের উত্তোরত্তর সমৃদ্ধি কামনা করেন। তার ভাষায় এ প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলা এবং কানাডিয়ান সাহিত্যের মধ্যে এক বিশেষ সেতুবন্ধন তৈরী হবে। তিনি মনে করেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া উচিৎ, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম বাংলার ইতিহাস এবং সাহিত্য সম্বন্ধে ধারণা লাভ করতে পারে। কালের গভীরে যেন হারিয়ে না যায় বাংলা সাহিত্য চর্চা।

বিয়াট্রস হাউসনার বলেন, এই লাইব্রেরি তার স্মৃতির পাতায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ আসনে আসীন। কারণ, তিনি একজন নতুন অভিবাসী হিসেবে এ লাইব্রেরীতে বসেই স্পেনিস ভাষার অনুবাদ শুরু করেন। তিনি মনে করেন এ লাইব্রেরীতে বাংলা অনুবাদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশী তরুণরা যেনো উৎসাহিত হয় এবং বাংলা ভাষাকে তুলে ধরতে পারে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

ড. জনম মুখার্জি তার বক্তব্যে ছোটবেলার কথা তুলে ধরেন এবং বাংলাদেশ নিয়ে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ কিছু স্মৃতিচারণ করেন। তার আত্মীয় স্বজন বাংলাদেশের খুলনা থেকে আগত। তিনি বাংলাদেশে গিয়েছেন এবং গবেষণা করেছেন। বর্তমানে তিনি রায়ারসন বিশ^বিদ্যালয়ে ব্রিটিশ আমলের বাংলা সমাজ নিয়ে পড়ান। অন্য সবার মতো তিনিও মনে করেন বাংলা সাহিত্যচর্চা অনেক গুরুত্বপূর্ণ কারণ এর মাধ্যমে ইতিহাস জানা যায়।

ক্যান্ডেভাল বলেন তরুণরা কালচার নিয়ে ¯ট্রাগল করে।  তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ যখন পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হয়েছিল তখনও এই স্ট্রাগলটা ছিল। সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে তারা এ প্রতিবন্ধকতা দূর করতে পারবে এবং ইতিহাস ও সাহিত্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানবে। ফলে, এক সংস্কৃতি থেকে অন্য আর এক সংস্কৃতিতে নিজেদের খাপ খাওয়ানোর ব্যাপারে নিজেদের সাহায্য করতে পারবে।

সবশেষে আকবর হোসেন আনুষ্ঠানিকভাবে বই দেয়ার প্রকল্পটি উদ্বোধন করেন। এরপর উপস্থিত বই প্রেমিকরা একে একে সারিবদ্ধভাবে বই বাছাইয়ে ঝুঁকে পড়ে। তারা তাদের পছন্দের বই হাতে পেয়ে মুখে সুখের হাসি মেখে যার যার গন্তব্যে ফিরে যান। 

উদ্বোধনী পর্বে সর্বমোট ২৯০টি বই দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। যার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সত্যজিত রায়, নাসরীন জাহান, শরৎচন্দ্র, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মহাশে^তা দেবী, হুমায়ূন আহমেদ, সৈয়দ শামসুল হক, জীবনানন্দ দাশ, সেলিনা হোসেন, মঈনুল আহসান সাবের, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, লীলা মজুমদারের বই উল্লেখ্য। দর্শকরা হলের দুপাশে সাজানো বইয়ের টেবিল থেকে নিজেদের পছন্দমত বই তুলে নেন এবং স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে তা নিবন্ধন করেন। বইপ্রেমীদের মনে হচ্ছিল প্রাণের আড্ডায় মেতে উঠেছে মুহূর্তেই। তারা তাদের প্রিয় বই হাতে পেয়েই আনন্দ ভাগাভাগি করেছেন একে অপরের সাথে। বাংলাদেশ থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে কানাডা’র টরন্টোতে বই পড়া প্রকল্পের এমন একটি উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।

 

মানজু মান আরা, কবি, টরন্টো

 

 

২০ নভেম্বর, ২০১৭ ২২:৩৬:১৩