ঐশ্বরিয়ার বিয়ে এবং বোমকাই শাড়ির কথা
অ+ অ-প্রিন্ট
মুম্বাইয়ের বিশ্বখ্যাত সুন্দরী নায়িকা ঐশ্বরিয়া রাই এর বিয়ে হয়েছিল জননন্দিত নায়ক অমিতাভ বচ্চনের ছেলে অভিষেক বচ্চনের সাথে। সালটা ছিল ২০০৭। ঐশ্বরিয়ার বিয়ে হয়েছিল তিনদিন ধরে। শুরু হয়েছিল ১৮ এপ্রিল।  চূঢ়ান্ত পরিণতি ঘটে ২০ তারিখে। বিয়েতে যে তিনটি শাড়ি দেওয়া হয় সেগুলো ছিল বোমকাই। বিশেষ নাম ছিল ‘রাধাকুঞ্জ’। শাড়িগুলোর ডিজাইনার ছিলেন ভারতের ওড়িষ্যার সোনপুরের চতুর্ভুজ মেহের। জয়া বচ্চন চতুর্ভুজের করা তিনটি শাড়ির একটি ঐশ্বরিয়াকে বিয়েতে দেন। যে শাড়িটি পরে ঐশ্বরিয়া বিয়ের চূড়ান্ত করেন সেটি ছিল মেরুন রঙের। ওই শাড়িটি বানাতে চতুর্ভুজের তিনমাস লেগেছিল বলে এক সাক্ষাৎকারে শিল্পী জানান।

বলে রাখা যেতে পারে যে চতুর্ভুজ মেহের হলেন ভারতের শ্রেষ্ঠ তন্তুবায়দের একজন। টাই-ডাই ঐতিহ্যের খ্যাতিমান এই শিল্পী সোনপুরে তাঁতশিল্প গবেষণা প্রতিষ্ঠানে দশ হাজারের বেশি কর্মীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন বলে জানা যায়। ২০০৫ সালে ভারত সরকার চতুর্ভুজ মেহেরকে ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ ওড়িষার গঞ্জাম জেলার বোমকাই গ্রামের নামে বোমকাই শাড়ির নাম। অনেকেই মনে করেন বোমকাই শাড়ি নুতন করে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল ঐশ্বরিয়ার জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের কারণেই। বলা যায় বোমকাই শাড়ির নতুন করে আবিষ্কার ঘটেছিল  সেই সময় থেকে।

সাধারণত ছোট্ট ছোট্ট বোমকাই বুটি তাঁতে বোনা এই শাড়ির বিশেষত্ব। সুতি বা সিল্ক দু ধরনের শাড়িতেই বোমকাই কাজ থাকে। প্রাচীনকালে পাটনার রাজা রামাই দেবের আমলে এই শাড়ি সোনপুরে প্রচলন প্রচলন পায়। একসময় বোমকাই বা সোনপুর শাড়ি শুধুমাত্র ওড়িষ্যার স্থানীয় রাজা ও সম্ভ্রান্তদের জন্যে তৈরি করা হতো।

মোটামুটি সাত মাস লাগে একটি বোমকাই শাড়ি বুনতে। সারা পৃথিবীজুড়ে কত্থক নৃত্যের শিল্পীরা বোমকাই শাড়ি পড়ে থাকেন।

শাড়ি সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তি মাত্রই জানেন, বোমকাই হলো ইক্কত শাড়ির একটি ধরন। বলা হয়ে থাকে যে, ইন্দোনেশিয়ার ‘ম্যাঙ্গিকাত’ থেকে ‘ইক্কত’ শব্দটি এসেছে। মনে করা হয়, ফারোহার কবরে ইক্কত বুননের শাড়ির প্রথম সন্ধান পাওয়া যায়।

বোমকাই শাড়িতে থাকে ইক্কতের কাজ। হালকা রঙিন জমিন, সাথে পুঁতির আঁচল। আঁচলের কাজে থাকে মন্দিরের চূড়ার ধরনের হাতের কাজ। আঁচলে কখনও কখনও অন্য মোটিফ যেমন মাটির পাত্র, হীরের আকৃতি, পুঁতি বা ফুলেল মোটিফও থাকে।

বোমকাইয়ের বিশেষত্ব হলো এর উজ্জ্বল রঙের কনট্রাস্ট পাড় এবং পালাওতে ভারী কাজ। পুরির জগন্নাথ মন্দিরের চারটি মূল রঙের সাথে এর সাযুজ্য আছে। সবার একথা জানা যে সাদা, কালো, লাল এবং হলুদ ওই পুরির মন্দিরে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। গাঢ় একটি রঙের ডাবল শেডের আঁচল হলো বোমকাই শাড়ির প্রধান আকর্ষণ। 

বোমকাই ধরনটি রঙিন বা সোনালী সুতো দিয়ে হাতে বোনা হয়।  

বোমকাই শাড়ির সাধারণভাবে পাঁচ রকমের হয়ে থাকে:  সম্বলপুরী, সোনপুরী, পাশাপালি, বড়োপালি এবং বাপটা।

বোমকাই শাড়ি নিয়ে এতক্ষণ অনেক কথা জানলাম। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই প্রবাসে, বাংলা থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে বসে বোমকাই দেখবো কীভাবে? চিনবো কীভাবে? কিনবো কীভাবে? পাঠক বন্ধুরা জেনে আনন্দিত হবেন টরন্টো শহরের বেশ কিছু দোকানে বোমকাই পাওয়া যায়। আর ড্যানফোর্থের শাড়ি হাউসকে তো বোমকাইয়ের আড়ত যাকে বলে। সময় করে একবার চলুন দেখে আসি। বুঝে আসি কোন সে শাড়ি পরে স্বপ্নের নায়িকা ঐশ্বরিয়া বিয়ে করেছিলেন! চলুন পরিবারের মানুষটিকে বোমকাই শাড়িতে ঐশ্বরিয়ার মতো সুন্দরী করে সাজানোর কথা আমরাও ভাবি।  

১৬ নভেম্বর, ২০১৭ ০৯:৪০:০০