টরন্টোতে বাঙালি লেখক সম্মেলন
বাঙালি-কানাডীয় সেতুবন্ধ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ
শিউলী জাহান
অ+ অ-প্রিন্ট
অত্যন্ত সফলতার সাথে সম্পন্ন হলো টরন্টোর বেঙ্গলি লিটারারি রিসোর্স সেন্টার (বিএলআরসি) আয়োজিত বাঙালি লেখক সম্মেলন ২০১৭। টরন্টোর ৯ ডজ রোডের রয়েল কানাডিয়ান লিজিয়ন হলে  বিপুল সংখ্যক বাঙালি এবং কানাডিয়ান বহুভাষী লেখকদের সমাগমে আনন্দঘন ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে বিনিময় হলো বহুজাতিক সাহিত্যের সুবাতাস।

বাঙালি লেখক সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে কানাডীয় সাহিত্যাঙ্গন এবং বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন  ব্যক্তিত্ব উপস্থিত থেকে আয়োজনটিকে সমৃদ্ধ করেন। উপস্থিত ছিলেন টরন্টো পোয়েট লরিয়েট অ্যান মাইকেলস, বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক আসাদ চৌধুরী, কবি ইকবাল হাসান, লেখক ড. দিলীপ চক্রবর্তী, রাইটার্স ইউনিয়ন অব কানাডার নির্বাহী পরিচালক ঔপন্যাসিক, কবি ও কলামিস্ট জন ডেগেন এবং রাইটারস ট্রাস্ট অব কানাডার নির্বাহী পরিচালক মেরি অসবর্ন। উদ্বোধনী পর্বে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বিচেস-ইস্টইয়র্ক এলাকার এমপিপি আর্থার পটস।

কবি ও ঔপন্যাসিক টরন্টোর পোয়েট লরিয়েট বিএলআরসি লেখক সম্মেলনের দ্বিতীয় আয়োজনকে প্রশংসনীয় জানিয়ে বলেন, বিএলআরসির প্রথম সম্মেলনের সাফল্যের পর এই দ্বিতীয় আয়োজন আরও বেশি সাফল্যময়। দ্বিভাষিক সাহিত্যচর্চা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে বিএলআরসি একটি ইতিহাস তৈরি করতে যাচ্ছে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। বিএলআরসি'র নির্বাহী পরিচালক সুব্রত কুমার দাস ও সংগঠনের সংশ্লিষ্ট সকল আয়োজকের প্রতি তিনি আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

শুভেচ্ছা বক্তব্যে বিএলআরসি’র সভাপতি ড. রাখাল সরকার সংগঠনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের ওপর আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, এই লেখক সম্মেলনের মধ্য দিয়ে বিএলআরসি অন্যতম দুটি লক্ষ্যকে অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে, বাংলা সাহিত্যের মূলধারার সাহিত্যকে কানাডিয়ান সাহিত্যাঙ্গনে সুপরিচিত করে তোলা। আর দ্বিতীয়ত হলো আমাদের নতুন প্রজন্মকে তাদের উৎসের সন্ধানে উৎসাহিত করা।

বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক আসাদ চৌধুরী তাঁর স্বরচিত একটি কবিতা বাংলা ও ইংরেজিতে পাঠ করে বক্তব্য শুরু করেন। তিনি সংক্ষেপে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের গর্বিত ইতিহাসের কথা স্মরণ করে বিএলআরসি'র এই সার্বিক আয়োজনকে স্বাগত জানান।

কবি ইকবাল হাসান তাঁর বক্তব্যে কানাডীয় সরকারের মানবিক দায়বোধের কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশে  রোহিংগা শরণার্থীদের প্রতি মানবিক পদক্ষেপ নেয়ায় দূর প্রবাস থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তিনি বিএলআরসি'র এই আয়োজনের প্রতি তাঁর সমর্থন ব্যক্ত করেন।

রাইটার্স ইউনিয়ন অব কানাডার নির্বাহী পরিচালক ঔপন্যাসিক, কবি ও কলামিস্ট জন ডেগেন বিএলআরসি'র এই উদ্যোগকে প্রশংসা করে বলেন, তাদের রাইটার্স ইউনিয়ন কানাডার সব ভাষাভাষী লেখকদের নিয়ে কাজ করছে এবং বরাবরই উৎসাহ প্রদান করে আসছে। একজন 'ফুলটাইম' লেখক বা লেখাকেই পেশা হিসেবে নেবার ব্যাপারে কতটা ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়া যায় সে ব্যাপারে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।

রাইটারস ট্রাস্ট অব কানাডার নির্বাহী পরিচালক মেরি অসবর্ন বিএলআরসি'র এই বহুভাষিক লেখক সম্মেলনের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি কানাডার বহুভাষী লেখকদের সাহিত্যচর্চায় উৎসাহিত করার জন্য তাদের প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন প্রকল্প ও অনুদান বিষয় ব্যাখ্যা করেন।

লেখক ড. দিলীপ চক্রবর্তী তাঁর বক্তব্যে বলেন, কানাডিয়ান সাহিত্যের মতো বাংলা সাহিত্যেরও একটি ঐতিহ্যমণ্ডিত ইতিহাস আছে। যদিও কানাডায় বাঙালিদের অধিবাস দীর্ঘ যুগের কিন্তু সাহিত্যাঙ্গনে পারষ্পরিক বিনিময় এখনও সেভাবে গড়ে উঠেনি। বিএলআরসি এই ব্যবধানকে দূর করার পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে এসেছে।

টরন্টোর বিচেস-ইস্টইয়র্ক এলাকার এমপিপি আর্থার পটস বাঙালি কমিউনিটির এই উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়ে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। তিনি বাংলায় 'ধন্যবাদ' জানিয়ে উপস্থিত দর্শককে কিছুটা হলেও আপ্লুত করেন।

বিএলআরসি'র সাহিত্য কর্ম পরিকল্পনার একটি অন্যতম অনুসঙ্গ হচ্ছে বিএলআরসি সাহিত্য পত্রিকা। প্রথম সংখ্যার সফল আত্মপ্রকাশের ধারাবাহিকতা ধরে দ্বিতীয় সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়। নির্বাহী সম্পাদক গবেষক সুজিত কুসুম পাল সম্পাদকমণ্ডলী এবং লেখকদের নিয়ে সংখ্যাটির পাঠ উন্মোচন করেন। কানাডার কেন্দ্রীয় হেরিটেজ মন্ত্রী মেলানি জলি বিএলআরসিকে ধন্যবাদ জানিয়ে সাহিত্য পত্রিকার জন্য তার পাঠানো শুভেচ্ছা বার্তায় বলেন, বাংলা সাহিত্যকে বহুজাতিক কানাডিয়ানদের সাথে পরিচিত করাতে এই লেখক সম্মেলন একটি সেতু তৈরি করতে সাহায্য করবে। পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যাটিতে কানাডার বিভিন্ন প্রদেশে বসবাসরত ৭২ জন বাঙালি লেখকের রচনা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

সম্মেলনের মূল আয়োজনকে কয়েকটি পর্বে বিভক্ত করে সাজানো হয়েছিল। কবিতা, কথাসাহিত্য, প্রবন্ধসাহিত্য নিয়ে আলোচনা ও পাঠে অংশ নেন বাঙালি-অবাঙালি তরুণ ও প্রবীণ কবি ও লেখক।

প্রবাসী নতুন প্রজন্মের লেখকদের নিয়ে আলোচনা দিয়ে এই পর্বগুলোর ক্রম সূচনা হয়। বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে ভাবনা, সাহিত্যের প্রতি আগ্রহের অনুপ্রেরক ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা নিয়ে অদিতি কাজীর সঞ্চালনায় এই পর্বকে আলোকিত করেন অর্ক ভট্টাচার্য, সূচনা দাস বাঁধন, ব্রতী দাসদত্ত ও মেরিলিন সামান্থা পাণ্ডে।

কানাডার অনেক বাঙালি অভিবাসী লেখক তাদের সাহিত্যের মাধ্যম ইংরেজিকে বেছে নিয়েছেন। এর কারণ, সুবিধা-অসুবিধা ও ইংরেজি মাধ্যমে তাদের সাহিত্যচর্চার বিস্তৃতি নিয়ে আলোচনা হয় পরবর্তী পর্বে। তরুণ লেখক অর্ক ভট্টাচার্যের উপস্থাপনায় এই পর্বটিকে প্রাণবন্ত করেছেন আয়েশা চ্যাটার্জি, শুক্লা দত্ত, দোয়েলি ইসলাম, সঞ্চারী সুর এবং রেজা সাত্তার।

অনুবাদ সাহিত্য বৈশ্বিক সাহিত্য অঙ্গনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বসাহিত্যের দ্বারপ্রান্তে স্বদেশী সাহিত্যের ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে অনুবাদ একমাত্র পন্থা। এই অনুবাদ সাহিত্য নিয়ে ছিল পরবর্তী আয়োজন। মুক্তচিন্তক লেখক আকবর হোসেনের সঞ্চালনায় এই পর্বের লেখকগণ ছিলেন কানাডীয় কবি রোনা ব্লুম ও আনা ইয়িন। বাঙালি কবি ও অনুবাদক ছিলেন পারভেজ চৌধুরী এবং শাহানা আকতার মহুয়া!বাঙালি-কানাডীয় সেতুবন্ধ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ

ফিকশন বা কথাসাহিত্য নিয়ে আলোচনা ছিল পরবর্তী আয়োজন। চয়ন দাসের সঞ্চালনায় এই পর্বে অংশ নেন সৈয়দ ইকবাল, ফরিদা রহমান, সালমা বাণী, মামুনুর রশীদ, অটোয়া থেকে শাহিনুর ইসলাম এবং কুইবেকের লংগেইল শহর থেকে আব্দুল হাসিব।

নন-ফিকশন বা প্রবন্ধ সাহিত্যকে বোধকরি একটি সরল বাক্যে ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব নয়। সাহিত্যের এই অঙ্গটি অনেকগুলো ভাগের সমন্বয়। কিছু লেখকের মতে প্রবন্ধ সাহিত্যে সৃজনশীলতার কোনো  অবকাশ নেই, তবে ভিন্নমতের লেখকগণ মনে করেন প্রবন্ধ সাহিত্যেও সৃজনশীলতার চর্চা করা  যায়। সারিয়া তানজিম সুমনার সঞ্চালনায় তথ্যমূলক এই আলোচনা পর্বটিকে সমৃদ্ধ করেন হাসান মাহমুদ, সুধীর সাহা, সৈকত রুশদী এবং নজরুল মিন্টো।

বাংলা সাহিত্যে কবিতার ইতিহাস হাজার বছরের। একটি ভালো কবিতার দুটি চরণ মুহূর্তে পাঠক হৃদয়কে আন্দোলিত করে। এই কবিতা ও কবি নিয়ে সম্মেলনের শেষপর্বের আয়োজন। কবি ও লেখক দেলওয়ার এলাহীর উপস্থাপনায় কবিতা পাঠ এবং আলোচনায় এই পর্বকে ছন্দময় করেন অশোক চক্রবর্তী, রূমানা চৌধুরী, শওকত সাদী, শিউলী জাহান, সুলতানা শিরিন সাজি, মৌ মধুবন্তী ও মানজু মান আরা।বাঙালি-কানাডীয় সেতুবন্ধ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ

বাঙালি লেখক সম্মেলনের সার্বিক সু-সঞ্চালনায় ছিলেন তাসমিনা হায়াৎ খান। বিএলআরসি'র সচিব ফায়েজুল করিম উপস্থিক দর্শকদের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে অনুষ্ঠানটির সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টার এই আয়োজনে প্রবাসী সাহিত্যমোদী দর্শকদের মনোযোগ ও মুখর পদচারণায় প্রতীয়মান হয়, বাংলা সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা বাঙালি মন ও মানসে কতটা গভীরে প্রোথিত। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মর্যাদা বিশ্ব সাহিত্যের অঙ্গনে আরও দৃঢ় পদক্ষেপে অগ্রসর হোক এই কামনা ছিল বিশিষ্ট জনের পারস্পরিক আলোচনায়।বাঙালি-কানাডীয় সেতুবন্ধ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ

১৭ অক্টোবর, ২০১৭ ২০:৩২:২৬