এবারের দুর্গাপূজা: একটি ব্যক্তিগত অবলোকন
সুব্রত কুমার দাস
অ+ অ-প্রিন্ট
বিজয়া দশমী শেষে বিহ্বল ব্যারিস্টার চয়নিকা দত্ত ও স্বামী গুণী শিল্পী রনি রায়। ছবি: রাকিব রাশেদীন
উত্তর আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ শহর টরন্টো এবং পাশ্ববর্তী এলাকাগুলোতে অনেকগুলো দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। পূজা উপলক্ষে আয়োজন করা হয় ব্যাপক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও। সপ্তমী থেকে শুরু করে দশমী পর্যন্ত চলে ব্যাপক সে উদ্যোগ। যদিও সবাই জানেন সে-আয়োজনের শুরুটা ঘটে মহালয়ার দিন থেকেই। পূজার দিনগলোতে বাঙালি মন্দিরগুলোতে যতোগুলো সাংস্কৃতিক আয়োজন থাকে সারা বছর পুরো কমিউনিটির সামগ্রিক সাংস্কৃতিক আয়োজনের তুলনায় সেটি একেবারে কম নয়।  

টরন্টোতে কতোগুলো দুর্গাপূজা হয়? প্রশ্নটি একটু কঠিন। কঠিন এ কারণে যে পূজা এলেই টরন্টো এবং পাশের শহরগুলোর দূরত্ব অনেকখানি কমে যায়। টরন্টোর দর্শনার্থীরা দৌঁড়তে থাকেন ব্রাম্পটন, মিসিসাগাতেও। ওই সব শহরের মানুষেরাও আসেন টরন্টোতে। সীমানাটা মুছে যায় খুব সহজেই। কোন মন্দিরের আয়োজকদের মধ্যে কে কোন শহরের বেশি তা হিসেব করাও জটিল হয়ে পড়ে। আর তাই আমরা এই শহরের পূজা বলতে আমরা টরন্টো, ব্রাম্পটন, মিসিসাগা এবং মিল্টনের পূজাকেও বুঝে থাকি।   এবারের দুর্গাপূজা: একটি ব্যক্তিগত অবলোকন
টরন্টো ভারত সেবশ্রম সংঘের পূজা অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট বাঙালি ব্যক্তিত্ব শিউলি শিকদারের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন এনআরবি টেলিভিশনের পক্ষে লেখক সুব্রত কুমার দাস

এবার সপ্তমী পূজা শুরু হয়েছিল ২৭ সেপ্টেম্বর। দশমী পড়েছিল ৩০ তারিখ শনিবার। প্রধান যে পূজাগুলো টরন্টোকে কেন্দ্র করে ঘটেছে সেগুলো হলো ভারত সেবাশ্রম সংঘ (২১০৭ কডলিন ক্রিসেন্ট, ইটোবিকো), হিন্দু ধর্মাশ্রম (১৫১০ বার্চমাউন্ট রোড), বেদান্ত সোসাইটি (১২০ এমেট এভিনিউ), বাংলাদেশ কানাডা হিন্দু মন্দির (১৬ ডোম এভিনিউ), টরন্টো কালিবাড়ি (৬৮১৫ প্রফেশনাল কোর্ট, মিসিসাগা), টরন্টো দুর্গাবাড়ি (৪৩৩ বার্চমাউন্ট রোড) এবং বঙ্গীয় পরিষদ (১৪০ মিলউইক ড্রাইভ)। 

বলে রাখা যেতে পারে যে, প্রবাসে অফিসে ছুটি না থাকা, লোকবল কম থাকা, ভ্যেনু না পাওয়া ইত্যাদি কারণে সব মন্দিরে তিথি অনুযায়ী পূজা সম্পন্ন হয় না। ব্যাপারটি নতুন আসা যে কোনো প্রবাসীর জন্যে চমকে দেবার মতো। কিন্তু ব্যাপারটি সত্যি। সেটা শুধু টরন্টোতে নয়, কানাডার অনেক শহরেই ঘটে। আমেরিকার অনেক শহরেও ঘটে বলে জানা যায়। এ বছর প্রথামাফিক তিথির আগেই পূজা করেছেন হ্যামিলটনের সাগরপারে নামের সংগঠন। ওদের পূজা হয়েছিল ২৩ ও ২৪ তারিখে। ওদের দ্বিতীয় দিনের পূজাতে উপস্থিত ছিলেন হ্যামিলটনের মেয়র ফ্রেড আইজেনবার্গার। আবার অক্টোবরের ৭ ও ৮ তারিখে হচ্ছে আমার পূজা নামের সংগঠনের পূজাটি। 

২০১৩ সালের আগস্টে টরন্টোতে অভিবাসী হয়ে সে বছরেই পূজা পেয়ে গিয়েছিলাম আমি ও আমার পরিবার। বাংলাদেশিদের পরিচালনাধীন তিনটি মন্দিরেই প্রথম বছরের পূজা দেখার সুযোগ ঘটে। মন্দিরে মন্দিরে ঘুরেছি আর আপ্লুত হয়েছি। বারবার মনে হয়েছে প্রবাসে দুর্গাপূজা নিয়ে এমন আয়োজন! এতো বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি! এবারের দুর্গাপূজা: একটি ব্যক্তিগত অবলোকন

পূজার আচারের ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত আগ্রহ কম থাকলেও এর আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে আমার বিপুল আগ্রহ। পূজার উৎসবকে ভক্তির দৃষ্টির বাইরে মিলনের দৃষ্টিতে দেখতে চাই আমি। পূজাকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার মানুষের সংযোগ ঘটছে, প্রাণের উত্তাপ বিনিময় হচ্ছে, সেটাকে আমি অনেক বড়ো ভাবি। পূজাকে কেন্দ্র করে বিপুল সংখ্যক শিল্পীর উপস্থাপন ঘটছে মন্দিরগুলোর মঞ্চে, সেটাকে আমি বাঙালি সংস্কৃতির একটি চর্চা ও প্রচার বলেই মনে করি।  পূজার ম-পগুলোতে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের যে আগমন  ঘটছে সেটার মাধ্যমে অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়। আর তাই সামাজিক ঐক্য এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যম হিসেবে পূজাকে উপস্থাপন করতে অনেকের মতো আমারও ভালো লাগে।  

টরন্টোতে আসার পরের বছর অর্থাৎ ২০১৪ সালে অন্য আরও কয়েকটি মন্দিরে পূজা দেখা সম্ভব হলেও একবছরের পূজাতে সবকটি মন্দিরে যাওয়া হয়ে ওঠেনি কখনই। সেটা এবার হলো। কীভাব হলো? সে কথা বলবো এখন।    এবারের দুর্গাপূজা: একটি ব্যক্তিগত অবলোকন
  

পূজা শুরুর কয়েকদিন আগে টরন্টোর বাঙালি পোশাকের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান শাড়ি হাউসের রঞ্জন রায় জানালেন তাঁরা টরন্টোর পূজা টেলিভিশনে দেখানোর উদ্যোগ নিতে চান। তাঁদের ইচ্ছা সেটির পরিকল্পনা এবং উপস্থাপনা আমি করি। প্রস্তাবটি লোভনীয় হলেও চ্যালেঞ্জিং ছিল আমার জন্যে। কেননা, উপস্থাপনার কাজটি আমি করতে অভ্যস্ত নই। তাছাড়া সবকটি মন্দিরেও আমার খুব বেশি ঘনিষ্টতা নেই। এতো বিশাল একটি আয়োজনকে এতো অল্প সময়ে বাস্তবায়ন করাটিও সহজসাধ্য ছিল না। বৈঠক হলো এনআরবি টেলিভিশনের সিইও শহিদুল ইসলাম মিন্টুর সাথে। তিনি সম্মত হলেন। পরিকল্পনা হলো, বাজেট হলো। শাড়ি হাউস পুরো খরচ দিতে রাজি হলো। শুরু হলো কাজ। 

পরিকল্পনা হলো দুই মন্দিরের মহালয়া শুরুতে ধারণ করা হবে। পরে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী এবং দশমীর পূজা ধারণ করে প্রতিরাত ১১টায় প্রচার করা হবে। প্রথম শুটিং হবে ১৯ সেপ্টেম্বর, শেষটি হবে ৩০ সেপ্টেম্বর। প্রচার হবে ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত। 

অনুষ্ঠানের নাম ঠিক করা হলো। প্রমো তৈরী হলো। মহালয়ার দুইদিন আগেই শুরু হলো এনআরবি টিভিতে প্রচারণা। সোশাল মিডিয়াতেও ধুমছে প্রচার চলতে লাগলো। ২০ তারিখ রাতে প্রথমবারের মতো উত্তর আমেরিকার দর্শকেরা দেখলেন এনআরবি টেলিভিশনে ‘টরন্টো পূজা পরিক্রমা’। দূর দূর শহরে বসবাসরত মানুষেরা, বিশেষ করে যাঁরা মহালয়া দেখতে যেতে পারেননি, তারা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে শুরু করলেন। আমরা প্রাণিত বোধ করলাম। 

প্রথম দুটি পর্বে সহ-উপস্থাপক হিসেবে ছিলেন লিটলী রায় ও প্রতিমা সরকার। সহযোগিতায় থাকলেন নীলিমা দত্ত, শীলা হালদার এবং সুস্মিতা হালদার। তাঁদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। ক্রমে ক্রমে আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম পরবর্তী পর্বগুলোর দিকে। 

ভালো লাগতে শুরু করলো যখন বিপুল সংখ্যক শুভানুধ্যায়ী বিভিন্ন মাধ্যমে আমাদের কাজটিকে অভিনন্দিত করতে শুরু  করলেন। সহযোগিতার প্রস্তাব দিলেন। নিঃশর্তে পাশে এসে দাঁড়ালেন। আমরা উদ্বেলিত বোধ করতে শুরু করলাম। আমাদের শহরের দুর্গাপূজা ভিন্ন মাত্রা নিয়ে ফেললো। পাশে এসে দাঁড়ালেন অটোয়া ও উইনিপেগের বন্ধুরা। তাঁরা সেখানকার পূজার ভিডিও পাঠালেন। আমাদের পরিধি বাড়তে লাগলো। মন্ট্রিয়ল ও রেজাইনার পূজার ভিডিও সংগ্রহের জন্যে সেখানকার বন্ধুরা চেষ্টা চালিয়েছেন। সময় কম থাকায় সম্ভব হয়ে ওঠেনি। যে বন্ধুরা সদিচ্ছা দেখিয়েছেন তাদের প্রত্যেকের প্রতি আমি বিনীত অভিবাদন জানাই।  

মহালয়ার দুইদিন বাদেও সপ্তমী থেকে দশমী প্রতিদিন আমরা টিম নিয়ে বিভিন্ন মন্দিরে ঘুরে বেড়াতে শুরু করলাম। পূজা দেখানোর কাজটা হয়ে গেল আমার এবারের পূজার প্রধান অনুষঙ্গ। এবারই প্রথম বেদান্ত সোসাইটিতে আমার পূজা দেখা। মুগ্ধ হলাম। সুশৃঙ্খল পরিবেশে পূজা সমাপণের সেটি এক অনন্য উদাহরণ। 

এবারই জানতে পারলাম ব্রাম্পটনে একটি পরিবারের উদ্যোগে দুর্গাপূজা করা হয়েছে। আয়োজক দম্পতি পিয়ালী ও সুমন চক্রবর্তীর সঙ্গে যোগাযোগ করে ক্যামেরা নিয়ে চলে গেলাম সেখানে। পূজা শুটিং করতে করতে পুরনো অনেক বন্ধুর সাক্ষাৎকার নেওয়া হলো। সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে অনেক নতুন বন্ধুও তৈরি হলো। প্রতিদিন ঘুম থেকে জেগে নতুন যোগাযোগ স্থাপন এবং বিকেল হতেই টিম নিয়ে বেড়িয়ে গভীর রাতে ফেরা হয়ে দাঁড়ালো পূজার দিনগুলো আমার প্রাত্যহিক রুটিন।  

দশমী শেষ হয়েছে। সামাজিক বিধি অনুযায়ী অনেককেই ‘শুভ বিজয়া’ বলাটা এবার আমার হয়নি। অনেককে ফেসবুকের ইনবক্সে উত্তর দেওয়া হয়নি। অনেকের ফেসবুক পোস্টে লেখা হয়নি ‘শুভ বিজয়া’। অনেকের ইমেলের উত্তর দেওয়া হয়নি। অনেক জ্যেষ্ঠজনকে বলা হয়নি ‘বিজয়ার প্রণাম’। পূজা উপলক্ষে বাসাতে লুচি-লাবড়া বনিয়ে বন্ধুদের ডেকে খাওয়ানো হয়নি। এই লেখার মাধ্যমে তাঁদের সবার কাছে আমার অপারগতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করি।

পূজাশেষে এই লেখা যখন লিখছি তখনই ফোন দিলেন এক টরন্টোবাসী বন্ধুর স্ত্রী। জানতাম বৌদি গত পাঁচ-ছয় মাস ঘরে বন্দী। গাড়ী দুর্ঘটনায় পা ভেঙ্গে বন্দিত্ব ঘটেছে তাঁর। বললেন, ‘দাদা, সশরীরে মন্দিরে যেতে পারিনি, কিন্তু এনআরবি-তে পূজা দেখে মনের আকাক্সক্ষা মিটেছে। ফোনকথা চলতে চলতে চোখ জলে ভরে আসছিল। মনে হচ্ছিল ব্যক্তিগত পর্যায়ে পূজাটা উদযাপনের যে ঘাটতি ছিল এবার সেটা যেন পূর্ণ হয়ে গেল আমার। ব্রাম্পটনের এক বন্ধু জানালেন পূজার দিনগুলোতে মন্দিরে মন্দিরে থাকায় তিনি ‘টরন্টো পূজা পরিক্রমা’ দেখার সুযোগ পাননি। পূজাশেষে এখন ইউটিউবে সবকটি পর্ব দেখার প্লান করছেন। মনে হলো আমার চেয়ে সুখী মানুষ আর নেই। 

মনে হলো তাহলে নিশ্চয়ই কাজটি ‘কিছু একটা’ হয়েছে। যদি হয়েই থাকে তাহলে ভবিষ্যতে দর্শকদের প্রত্যাশার কথা আমাদের আরও বেশি করে মনে রাখতে হবে। মানকে আরও উন্নীত করতে হবে। আরও বেশি সংখ্যক মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে।  

আর তাই, সবার কাছে বিজয়ার আশীর্বাদ চাই। মানুষের জন্যে, সমাজের জন্যে নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণে কখনও যেন পিছু-পা না হই সবাই সেই আশীর্বাদ করবেন আমাকে।

  

 

০৩ অক্টোবর, ২০১৭ ২২:০৯:৩২