বি.সি.সি.এস-এমপ্লয়মেন্ট সাপোর্ট প্রোগ্রাম : জব সার্চ, ট্রেনিং আর নেটওয়ার্কিং এর নতুন উদ্যোগ
অজন্তা চৌধুরী
অ+ অ-প্রিন্ট
স্বপ্ন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, কাজের স্পৃহা দেয়। কিন্তু সুখ স্বাচ্ছন্দে সমৃদ্ধ জীবনের স্বপ্ন নিয়ে আপনজনদের পেছনে রেখে সুদূর কানাডায় এসে অনেকেই সম্মুখীন হোন স্বপ্নভঙ্গের বেদনার। নিজের শিক্ষা আর অভিজ্ঞতা অনুযায়ী একটি চাকুরী পাওয়া যেনো অনেকের কাছেই সোনার হরিণ হয়ে থেকে যায়। পদে পদে শত বাঁধা একসময় স্বপ্ন দেখাকেও দুরূহ করে দেয়। চাকুরী প্রাপ্তির পথে এইসব বাধাগুলো দূর করার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ সেন্টার (BCCS) কে সঙ্গী করে বাংলাদেশী-কানাডিয়ান কমিউনিটির অতি পরিচিত মুখ সমাজকর্মী রিজওয়ান রহমান এবার চালু করলেন ভিন্নধর্মী এক এমপ্লয়মেন্ট সাপোর্ট প্রোগ্রাম। গত ১২ই অগাস্ট বিকেল ৫ টায় ২৬৭০ ড্যানফোর্থ এভ্যেনুতে অবস্থিত বাংলাদেশ সেন্টার মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হলো এই এমপ্লয়মেন্ট সাপোর্ট প্রোগ্রাম এর উদ্বোধন। এতে অংশগ্রহণ করেন টরন্টো সিটি কাউন্সিলর জেনেট ডেভিস, টরন্টো ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ডের ট্রাস্টি পার্থি কানডাভেল, প্রকল্পটির সাথে জড়িত মেন্টর্স, স্পন্সরস এবং বাংলাদেশী কমুনিটির বিশিষ্টজনেরা। অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখতে গিয়ে বি.সি.সি.এস এর প্রেসিডেন্ট হাসিনা কাদের বাংলাদেশ সেন্টারের পক্ষ থেকে দেয়া বিভিন্ন সেবা সমূহের বিবরণ দেন। তরুণদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও গঠনমূলক বিভিন্ন কর্মকান্ডে জড়িত করতে গঠিত ইয়ুথ এনগেজমেন্ট ইনিশিয়েটিভ, সিনিয়রস প্রোগ্রাম সহ আরো অনেক কল্যানমুলক প্রোগ্রামের কথা তুলে ধরে তিনি কমিউনিটির সদস্যদের এইসব প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। এরপর এমপ্লয়মেন্ট প্রোগ্রাম এর উপদেষ্টা এবং বি.সি.সি.এস এর পরিচালক জনাব সৈয়দ আব্দুল গফ্ফার এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে মনোবল বৃদ্ধির জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন।বি.সি.সি.এস-এমপ্লয়মেন্ট সাপোর্ট প্রোগ্রাম : জব সার্চ, ট্রেনিং আর নেটওয়ার্কিং এর নতুন উদ্যোগ

প্রোগ্রামটির ব্যাপারে জানাতে গিয়ে রিজওয়ান বলেন যে এই প্রোগ্রামটি ৪ টি ধাপ এ হবে। প্রথম ধাপ হচ্ছে বিভিন্ন পত্রিকা, ফেসবুক এবং অন্যান্য প্রচার মাধ্যমে এই প্রোগ্রামটির ব্যাপারে কমিউনিটিকে জানানো আর চাকুরি প্রার্থীদের কাছ থেকে তাঁদের রেজ্যুমে সংগ্রহ করা। শুধুমাত্র ই-মেইল এর মাধ্যমে রেজ্যুমে পাঠানো যাবে, ই-মেইল আই ডি : [email protected] । প্রায় ৫ সপ্তাহ ধরে চলবে এই রেজুমে সংগ্রহ আর বাছাই। এর পর মেন্টরদের মিটিং এ এই রেজ্যুমেগুলো চাকুরী প্রার্থীদের শিক্ষা আর অভিজ্ঞতা অনুযায়ী বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হবে । এর পর শুরু হবে দ্বিতীয় ধাপ যেখানে চাকুরী প্রার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রশিক্ষন এর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই প্রশিক্ষন মূলত হবে "জব স্পেসিফিক" রেজুমে, নেটওয়ার্কিং, "এফেক্টিভ জব সার্চ" , "প্রফেশনাল কনভার্সেশন এন্ড এটিকেট" সহ আরো আবশ্যকীয় বিষয়ের উপর। এইসব ওয়ার্কশপ পরিচালনা করবেন "পুল অফ মেন্টর্স" এর সদস্যরা। রিজুয়ানের মতে, এই ওয়ার্কশপ গুলোও নেটওয়ার্কিং এর সুযোগ করে দেবে যেহেতু এগুলো যাঁরা পরিচালনা করবেন তাঁরাও কানাডা এর বিভিন্ন বড় কোম্পানীর কর্মকর্তা। প্রোগ্রাম এর তৃতীয় ধাপ হবে একটি আনুষ্ঠানিক ডিনার, যেখানে আমন্ত্রিত হবেন প্রথম দুই ধাপ এ অংশগ্রহণকারী চাকুরিপ্রত্যাশীরা, আর আসবেন কানাডার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তারা। আমন্ত্রিত এই দুই ধরনের অতিথিরা অনুষ্ঠানটিতে বিনামূল্যে অংশগ্রহণ করবেন। রিজওয়ানের মতে, এই ডিনারটিতে আসা চাকুরিপ্রত্যাশীদের সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে যে তাঁরা একই জায়গায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত অনেক কর্মকর্তাদের সাথে পরিচিত হবেন, নিজেদের যোগ্যতা আর অভিজ্ঞতার কথা আলোচনা করার সুযোগ পাবেন। আর আগত অতিথিরাও যেহেতু আন্তরিক সাহায্যের মানসিকতা নিয়ে আসবেন, তাই তাঁরাও মানসিক ভাবে প্রস্তুত থাকবেন এইধরনের আলোচনার জন্য। এর ফলে চাকুরী ভিত্তিক এই আলাপচারিতায় কোনো অস্বস্তিকর কোনো অনুভূতি হবেনা কারোই। দ্বিতীয় ধাপের কর্মশালাগুলোও এই ধাপে কাজে দেবে, কারণ ঐগুলোতে অংশ নেয়া চাকুরিপ্রত্যাশীরা ইতিমধ্যেই তৈরী হয়ে যাবেন কানাডার মূলধারার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সাথে কিভাবে নেটওয়ার্কিং করতে হয়, কিভাবে নিজের যোগ্যতা আর অভিজ্ঞতার কথা অল্প কথায় জানিয়ে দিতে হয় এইধরণের যাবতীয় "টিপস এন্ড ট্রিকস" এ। এই ডিনার এর পরবর্তী এক সপ্তাহে মেন্টর রা সিদ্ধান্ত নেবেন যে তাঁদের মধ্যে কে কে চাকুরিপ্রত্যাশী কাকে কাকে সরাসরি মেন্টর করবেন। একইভাবে আগত চাকুরিপ্রত্যাশীদের কাছেও জানতে চাওয়া হবে যে তারা কাকে তাদের মেন্টর হিসাবে পেতে চান। দুই পক্ষের আগ্রহ জেনে এবং এর মধ্যে সমন্বয় করে আয়োজকরা তাঁদের সিদ্ধান্ত চাকুরিপ্রত্যাশীদের জানাবেন। এর পর মেন্টর আর মেনটি রা নিজেরা যোগাযোগ করে ঠিক করে নেবেন যে কিভাবে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া উচিত। প্রোগ্রামের শেষ ধাপটি হবে "জব ফেয়ার"। আয়োজকরা আশা করছেন যে অন্তত ১০ থেকে ১৫ টি সংস্থার অংশগ্রহণে একটি জব ফেয়ার আয়োজন করবেন। এব্যাপারে প্রশ্ন করা হয় যে কমিউনিটিতে হয়ে যাওয়া আরো কয়েকটি জব ফেয়ার এর তুলনায় এর বিশেষত্ব কি হবে। প্রশ্নের উত্তরে রিজুয়ান বলেন দুঃখজনক হলেও সত্য যে অনেক জব ফেয়ার এ চাকুরী দেয়ার উদ্দেশ্যে আসা সংস্থার চেয়ে প্রচারণা চালাতে আসা সংস্থার সংখ্যাই বেশি দেখা যায়। তবে তাঁদের এই জব ফেয়ার এ উদ্দেশ থাকবে প্রকৃতই চাকুরীতে নিয়োগ দেয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে আসা সংস্থার সংখ্যাই যেনো বেশি থাকে। তিনি আরো জানান যে সারভাইভাল জব থেকে শুরু করে কর্পোরেট জব, সব ক্ষেত্রের চাকুরীদাতাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই তাঁর মূল উদ্দেশ হবে যাতে কমিউনিটির প্রত্যেকেই তাঁদের এই মুহূর্তের প্রয়োজন অনুযায়ী চাকুরীদাতাদের দেখা পান। প্রথম আয়োজনটি সফল হলে আয়োজকদের আসা তাঁরা পুরো প্রোগ্রামটি বছরে ২ থেকে ৩ বার পরিচালনা করতে পারবেন।

 “পুল অফ মেনটর্স" এ সদস্য হিসাবে আছেন জনসন এন্ড জনসন, এপোটেক্স, জ্যানসেন ইনক, ওয়ালমার্ট, সোবেইস, প্রাইসওয়াটারকুপার, এডিডাস কানাডা, লও'স কানাডা, স্কোশিয়া ব্যাংক, আর বি সি ব্যাংক, সি আই বি সি ব্যাংক, টি ডি ব্যাংক, রেজিস্টার্ড নার্সিং এবং রেডিসন হোটেল এর কর্মকর্তারা। রিজুয়ান জানান যে প্রোগ্রামটির কথা প্রচার হবার সাথে সাথেই আরো অনেক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাই যোগাযোগ করে মেন্টর হবার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাই অচিরেই এই পুল অফ মেনটর্স এর সদস্য আরো অনেক বাড়বে। আর পুরো প্রোগ্রামটিতে স্পনসর হিসাবে আছেন বিশিষ্ট রিয়েল এস্টেট ব্রোকার মানিক চন্দ, রিয়েল এস্টেট এজেন্ট এনামুল হক, ব্যারিস্টার ওয়াসিম আহমেদ এবং গ্লোবাল সিটিজেন প্রপার্টি এন্ড ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট ইনক। রিজুয়ান গর্বের সাথে বলেন যে কমিউনিটির এইসব উদার স্পনসরদের সহায়তার কারণেই কোনো রকম সরকারি অনুদানের জন্য যে কারো দরজায় কড়া নাড়তে হচ্ছেনা, অপেক্ষা করতে হচ্ছে না, এটাও আমাদের জন্য গর্বের ব্যাপার।

বাংলাদেশ থেকে যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষ যখন বিদেশের মাটিতে পা রেখে চাকুরী নামক সোনার হরিনের পিছনে ছুটতে থাকেন তখন কতটা হতাশা তাদেরকে গ্রাস করে তা কম বেশি সবার অভিজ্ঞতার ঝুলিতেই আছে। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে রিজুয়ানের এই প্রকল্পটি আশার আলো দেখাবে এতে কোনো সন্দেহ নেই । তাই উপস্থিত সুধীসমাজ সাধুবাদ জানিয়েছেন এবং পাশে থাকার অঙ্গীকার দিয়েছেন এমন একটি মহৎ উদ্যোগের সাথে। অনুষ্ঠানে মেন্টরদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সোবি'স কানাডা এর ফিনান্স ম্যানেজার ফাহাদ রফিক, এডিডাস এর কর্মকর্তা রাভি মেহ্তা, লো'স কানাডা এর প্ল্যানিং ম্যানেজার গিজেম ওজডেমির, এপটেক্স ফার্মাসিউটিক্যালস এর বিজনেস এনালিস্ট নায়লা আহমেদ। মেন্টরদের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন স্কোশিয়াব্যাংক এর বিপ্লব কর, জ্যানসেন এর মারিয়া রুবিয়ানো, জাপানের ওকায়ামা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রিমোট রিসার্চ ডাটা এনালিস্ট অজন্তা চৌধুরী, প্রাইসওয়াটারকুপার এর ইকবাল হোসাইন, রেজিস্টার্ড নার্স সাবিনা বারী লাকী, কমিউনিটির পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন ঘরোয়া রেস্টুরেন্ট এর স্বত্বাধিকারী সৈয়দ সামসুল আলম এবং নওশের আলী। অনুষ্ঠানটিতে চমৎকার উপস্থাপনায় উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করে রাইফাহ নাজাহ খান। এই প্রোগ্রামের অংশগ্রহণে আগ্রহী চাকুরী প্রার্থীদের উদেশ্যে স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রচারিত হবে বলে জানান প্রোগ্রাম লীডার রিজওয়ান রহমান।

ছবি সৌজন্যে মাহবুবুল হক ওসমানী

১৬ আগস্ট, ২০১৭ ০৭:৩৯:২৫