রঙ্গলাল দেব চৌধুরীর গ্রন্থের পাঠ উন্মোচন অনুষ্ঠানে অধ্যাপক রাখাল সরকার
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে শেকড়ের খবর পৌঁছানোর দায়িত্ব আমাদের
শিউলী জাহান
অ+ অ-প্রিন্ট
টরন্টোর বেঙ্গলি লিটারারি রিসোর্স সেন্টারের (বিএলআরসি) উদ্যোগে প্রকাশিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংগীতশিল্পী রঙ্গলাল দেব চৌধুরীর স্মৃতিকথা ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের পেছনের কথা’ গ্রন্থের পাঠ উন্মোচন আয়োজিত হয় গত ২৫ মার্চ।  

দীর্ঘ এতো বছর পর তাঁর গ্রন্থটি প্রকাশের জন্য রঙ্গলাল দেব চৌধুরী বিএলআরসি-র নির্বাহী পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করেন, “আমার বইটি পাঁচ বছর ঘুরে ঘুরে আজ প্রকাশিত হয়েছে। বইটি আরও আগে বের হওয়া  উচিত ছিল কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে বের হতে পারেনি।“ বলতে গিয়ে আবেগ, আনন্দ ও হয়তো কিছু ক্ষোভ তাঁকে অশ্রুসিক্ত করে তোলে। উল্লেখ্য যে তিনি মুক্তিযুদ্ধ ও দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে জীবনের শেষপ্রান্তে এসে তাঁর অভিজ্ঞতা নিয়ে গ্রন্থটি প্রকাশ করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। অথচ দীর্ঘ পাঁচ বছর বাংলাদেশের কয়েকটি প্রকাশনীতে তাঁর পাণ্ডুলিপিটি  কেবল ঘুরে বেরিয়েছে কিন্তু জনসম্মুখে আলোকিত হবার সুযোগ করে উঠতে পারেনি।

মুক্তিযুদ্ধ এবং দেশমাতৃকার প্রতি ভালোবাসার এক আবেগঘন পরিবেশে অনুষ্ঠানটি শুরু হয় রঙ্গলাল দেব চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জ্ঞাপন করে। বিএলআরসি-র নির্বাহী পরিচালক সুব্রত কুমার দাস মঞ্চে উপবিষ্ট রঙ্গলাল দেব চৌধুরীর গলায় উত্তরীয় পরিয়ে দেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ড. রাখাল সরকার।  মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের জন্মলগ্নের ইতিহাস সম্বলিত এই ধরণের প্রত্যক্ষ স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ প্রকাশনার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “প্রবাসের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে শেকড়ের খবর পৌঁছানোর দায়িত্ব আমাদের।“ রঙ্গলাল দেব চৌধুরী এবং তাঁর সমসাময়িক আরও যারা আছেন তাদের অভিজ্ঞতাগুলো লিপিবদ্ধ করে গ্রন্থাকারে প্রকাশ এবং অনুবাদ আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে  জানার পরিধি বিস্তৃতির জন্য সহায়ক হবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন, বিএলআরসি এ ব্যাপারে ভবিষ্যতে আরও অগ্রণী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের পেছনের কথা’ গ্রন্থের আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন, অধুনালুপ্ত টরন্টোর আজকাল পত্রিকার সম্পাদক সৈয়দ আবদুল গফফার, লেখক সায়ীদ যাদীদ, বিএলআরসি-র পরিচালক ও রাজনীতিক ফায়েজুল করিম,  লেখক প্রণবেশ পোদ্দার এবং লেখক রোজানা নাসরীন।

গ্রন্থটির সম্পাদনা পরিষদের সাথে যুক্ত লেখক রোজানা নাসরিন সম্পাদনাকালীন সময়ে তাঁর অনুভূতি এবং এ-ধরণের গ্রন্থ প্রকাশের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেন।

লেখক প্রণবেশ পোদ্দার একটি সার্থক ভূমিকা সংযোজন করে গ্রন্থটির তথ্যের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে কণ্ঠশিল্পী রঙ্গলাল দেব চৌধুরীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন এবং একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ নেবার জন্য বিএলআরসিকে ধন্যবাদ জানান। সেই সাথে মুক্তিযুদ্ধ ও সকল শহীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবসকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত করার জন্য জন্য সকলকে এগিয়ে আসতে অনুরোধ করেন।

লেখক সায়ীদ যাদিদ গ্রন্থটির পরিপ্রেক্ষিত, ঘটনার পারিপার্শ্বকতা, জানা অজানা তথ্যের তুলনামূলক তথ্যাদি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা উপস্থাপন করে গ্রন্থটির মূল্যায়ন করেন।

টরন্টোর অধুনালুপ্ত আজকাল পত্রিকার সম্পাদক সৈয়দ আবদুল গাফফার বলেন, “বইটি পড়তে যেয়ে মনে হয়েছে এর প্রতিটি কথা আমি আগে শুনেছি। আজ থেকে দশ বছর আগে যখন তাঁর সাথে পরিচয় হয়েছে তখন আমি আর আমার সহকর্মী বিদ্যুৎ সরকার অনেক গল্প শুনেছি তাঁর কাছ থেকে।“ তিনি আরো বলেন, “সময়ের সাথে সাথে আমরা কে কোন অবস্থায় যাবো আমরা জানি না। তিনি যে স্মৃতিটুকু স্মরণ করতে পেরেছেন আমরা হয়তো এই বয়সে সেটুকুও পারবো না। তাঁর লেখায় সময় তারিখ না দিলেও তিনি যেটুকু আমাদের দিয়ে গেছেন সেটুকুই একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করবে বলে আমার বিশ্বাস।“

বিএলআরসি-র পরিচালক ও রাজনীতিক ফায়েজুল করিম অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, “মুক্তিযুদ্ধে রঙ্গলাল দেব চৌধুরীর মতো মানুষেরা সংগ্রাম করেছেন, জীবন দেবার ব্রত নিয়েছিলেন। তাই আজ আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন বাংলাদেশ।“ তিনি গ্রন্থটির প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “এই গ্রন্থটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস নয়, বইয়ের মূল বিষয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা যা মুক্তিযুদ্ধের একটি খণ্ডিত অংশ। আমরা কৃতজ্ঞ যে তাঁর লেখার মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠার কথা, তাঁর শিল্পীজীবন, বেতার কেন্দ্রে তাঁর অবদান এবং যুদ্ধকালীন সময়ে তাঁর নিজের কথা।“

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের পেছনের কথা গ্রন্থ থেকে পাঠ করেন শিউলী জাহান। পুরো অনুষ্ঠানটি প্রশংসনীয় দক্ষতায় সঞ্চালন করেন চয়ন দাস।

টরন্টোর সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সুপরিচিত বাচনিক শিল্পী সুব্রত পুরু, সুমন মালিক এবং শেখর ই গোমেজ তাঁদের অনবদ্য আবৃত্তি দিয়ে দর্শকের হৃদয়কে আন্দোলিত করেন। সেই সাথে জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে মামুনূর রশীদ, কাবেরী দত্ত ও মুক্তি প্রসাদ উপস্থিত দর্শকদের যেন নিয়ে যান সুদূরে ফেলে আসা সবুজ শ্যামল সেই বাংলাদেশে।

২৮ মার্চ, ২০১৭ ২৩:২৯:৩৬