প্রবাসে শেকড়ের টানে টরন্টোতে প্রথম যাত্রাপালা
শিউলী জাহান
অ+ অ-প্রিন্ট
ভিন্নমাত্রার উৎসাহ, উচ্ছাস এবং কৌতূহলে টরন্টোয় প্রথমবারের মতো টরন্টো থিয়েটার প্লাস-এর উদ্যোগে টরন্টোর বার্চমাউন্টের গ্রান্ড প্যালেস ১৮ এবং ১৯ মার্চ দুদিনব্যাপী মঞ্চায়িত হলো ঐতিহাসিক যাত্রাপালা নবাব সিরাজউদ্দৌলা। 

যাত্রা মূলত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় লোকনাট্যধারা। সংস্কৃত শব্দ ইয়াত্রা থেকে বাংলা যাত্রার উদ্ভব। গ্রামবাংলার মানুষের জীবনে প্রাচীনতম বিনোদনের একটি অংশ। অতিনাটকীয় ভাবভঙ্গি ও আবৃত্তির মাধ্যমে কাহিনিকে উপস্থাপনা যাত্রার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সঙ্গীত ও নৃত্যকে বলা হয় যাত্রার প্রাণ। তবে ৯ম এবং ১২শ শতক পর্যন্ত সঙ্গীত-নৃত্যের প্রয়োগ খুব একটা ছিল না কিন্তু পরবর্তীতে এর অন্তর্ভুক্তি যাত্রাকে আরও বৈচিত্রময় এবং আবেদনময় করে তোলে। জানা যায়, উত্তরকালের যাত্রার আদিরূপ ছিল ষোড়শ শতকে প্রচলিত কৃষ্ণযাত্রায় বাদ্যযন্ত্র ও  সম্মিলিত সংগীতের ব্যবহার।

এক গুচ্ছ প্রবীণ এবং নবীন নাট্যমোদী এবং সাংস্কৃতিককর্মীর প্রাথমিক ভাবনা তারপর উদ্যোগ, পরিকল্পনা এবং দীর্ঘ চার মাসের মহড়ায় অতঃপর সফলভাবে মঞ্চে পরিবেশন। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা বা মির্জা মুহাম্মাদ সিরাজ-উদ-দৌলা (জন্ম: ১৭৩২ - মৃত্যু: ১৭৫৭) বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব। আলীবর্দী খাঁর দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল সিংহাসনে বসেন। তখন তার বয়স মাত্র ২২ বা মতান্তরে ১৮ বছর। পলাশীর যুদ্ধে তাঁর পরাজয় ও মৃত্যুর পরই ভারতবর্ষে প্রায় ২০০ বছরের ইংরেজ-শাসনের সূচনা হয়। ঐতিহাসিক এই পটভূমি নিয়ে রচিত নবাব সিরাজউদ্দৌলা যাত্রাপালা বাঙালিদের কাছে একটি জনপ্রিয় যাত্রাপালা হিসেবে আজও সমাদৃত। বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এই মাত্রাকে সামনে রেখে এবং যাত্রাশিল্পকেও প্রবাসের সাংষ্কৃতিক অঙ্গনের অংগীভূত করার প্রয়াসে টরন্টো থিয়েটার প্লাসের মূল দুই উদ্যোক্তা মানিক চন্দ ও রিজুয়ান রহমান নবাব সিরাজউদ্দৌলা যাত্রাপালাকে প্রথম মঞ্চায়নের জন্য নির্বাচিত করেন।প্রবাসে শেকড়ের টানে টরন্টোতে প্রথম যাত্রাপালা

শীতের সন্ধ্যায় হলভর্তি সব বয়সী বাঙালির সমাগমে বুঝতে এতটুকু অসুবিধা হয় না যে বাঙালি কমিউনিটিতে এই যাত্রাপালা কতটা আগ্রহের উদ্রেক করেছে। যারা যাত্রা সম্পর্কে জানেন কিন্তু দেখেননি এবং যাদের কাছে যাত্রা শব্দটি একেবারে অপরিচিত তাদের সবাই ছুটির দিনের এই সন্ধ্যায় বিপুল উৎসাহ নিয়ে মঞ্চের সামনে হাজির হয়েছেন। পরিবারের সাথে নতুন প্রজন্মের যারা এসেছে তাদের চোখে মুখে কিছুটা অস্বস্তি, কিছুটা কৌতূহল। প্রথম আয়োজনে লোক সমাগম এবং প্রস্তুতি পর্বে প্রায় ঘন্টাখানেকের বিলম্বিত অপেক্ষার ফাঁকে কথা হয় মায়ের সাথে আসা এই প্রজন্মের এক তরুণীর সাথে - "আমি জানি না যাত্রা কী? কিন্তু মনে হয়েছে ইন্টারেস্টিং হতে পারে।"

অজন্তা চৌধুরী এবং অরুণা হায়দার তাদের প্রাঞ্জল উপস্থাপনায় আয়োজনের সূচনা করেন।

উচ্চলয়ের তুমুল বাদ্যযন্ত্রের সাথে দর্শক সারির মাঝ দিয়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলা মঞ্চে উঠার সাথে সাথে দর্শক দৃষ্টি স্থির হয়ে বসে মঞ্চে। তারপর একে একে ঘটে যেতে থাকে ঐতিহাসিক চরিত্রদের পালাবদল, দেশপ্রেম, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, বিশ্বাসঘাতকতা, যুদ্ধ, পরিশেষে নবাবের মর্মান্তিক পতন।

তার মাঝে মাঝে নৃত্যশিল্পীদের সঙ্গীতের সাথে পরিশীলিত ধ্রপদী নৃত্য দর্শকদের আবেগ এবং উত্তেজনাকে প্রশমিত করতে যথেষ্ট কাজে দেয়। বস্তুত এই নৃত্যের সংযোজন দর্শকদের জন্য একটু বিরতি হিসেবে কাজ করে এবং কলাকুশলীদের পরবর্তী দৃশ্যায়নের জন্য পরিচ্ছেদ এবং মেকাপ পরিবর্তন নিমিত্তে ব্যবহার হয়।

প্রথম দৃশ্যপট নবাবের প্রাসাদকক্ষে আলেয়ার আগমন দিয়ে। এই দৃশ্যে দেখা যায় গোলাম হোসেন, মোহন লাল এবং বেগম লুৎফুন্নেছা। এখানে আলেয়া প্রাসাদ যড়যন্ত্রের গোপন কিছু খবর দিলে বিশ্বাস-অবিশ্বাস হেতু আলেয়ার প্রকৃত পরিচয়ের উদ্ঘাটন ঘটে। প্রথম দৃশ্যে সবার অভিনয়ে কিছুটা আড়ষ্টতা ধরা পরে, হয়তো মঞ্চ ও দর্শকদের সাথে ধাতস্ত হতে একটু সময় নিতে হয়েছে। নবাবের কণ্ঠের বলিষ্ঠতার অভাবে নবাবের চরিত্রে নির্বাচন নিয়ে দর্শকসারিতে কিছু মন্তব্য শোনা যায়। পরবর্তীতে সেই ঘাটতি অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হন এই চরিত্রে রূপদানকারী মানিক চন্দ। গোলাম হোসেনের চরিত্র অনেকটাই নবাব সিরাজউদ্দৌলা যাত্রাপালার ‘বিবেক’ হিসেবে কাজ করে। প্রথম থেকেই এই চরিত্র রূপায়নকারী শেখর ই গোমেজ তার সাবলীল অভিনয় দক্ষতা  এবং কণ্ঠমাধুর্য দিয়ে চরিত্রটিকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে দর্শক সন্তুষ্টি জয় করে নেন। আলেয়া চরিত্রটি কাহিনির অন্যতম একটি পার্শ্ব চরিত্র। অরুন্থিয়া উর্মি পুরোপুরি না হলেও মানিয়ে নিতে চেষ্টা করেছেন। নবাবের স্ত্রী লুৎফুন্নেছার চরিত্রে অভিনয় করেন লিটলী রায়।প্রবাসে শেকড়ের টানে টরন্টোতে প্রথম যাত্রাপালা

দ্বিতীয় দৃশ্য শুরু হয় প্রাসাদ যড়যন্ত্রের মূল চরিত্র ঘসেটি বেগমের আগমন দিয়ে। ভয়ানক কুটিল এই চরিত্র নবাব সিরাজউদ্দৌলার আপন খালা। ক্ষমতা ও সম্পদের লোভের বশবর্তী হয়ে তিনি নবাবকে ক্ষমতাচ্যুত করার এই যড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। এই দৃশ্যে রাজা রাজ্ বল্লভের সাথে তাঁর কথোপকথন দর্শক মনোযোগ কেড়ে নেয়। জাহানারা চিনু সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন এই চরিত্রটিকে ফুটিয়ে তোলার জন্য এবং বলা যায় তিনি তার আশাতীত অভিনয় দিয়ে সেটা করতে সক্ষম হয়েছেন। রাজ্ বল্লভের চরিত্র চিত্রণে মেহরাব রহমান তার সাবলীল অভিনয় অক্ষুন্ন রেখেছেন।

পরবর্তী দৃশ্যায়নে ক্যাপ্টেন ওয়াটস, প্রধান সেনাপতি মীর জাফর, রাজবল্লভ, জগৎ শেঠ এবং উমিচাঁদের আবির্ভাব এবং সেই সাথে আলেয়ার উপস্থিতি। এখানে গোলাম হোসেন ও মোহন লাল সহযোগে নবাবের প্রবেশ। এই অংশটি পুরো যাত্রাপালার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ক্ষমতা, কূট-কৌশল, প্রতারণা, অসত্য সমর্থন, নবাবের দেশপ্রেম এবং দেশ রক্ষায় কর্তব্যবোধ নিয়ে আবেগময় সংলাপ। এই দৃশ্যে নবাব সিরাজউদ্দৌলার চরিত্রে মানিক চন্দ দর্শক হৃদয় জয় করেছেন। কুচক্রী প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খান, নবাবের বিরুদ্ধে প্রাসাদ যড়যন্ত্র, রাজনৈতিক এবং সামরিক ষড়যন্ত্রের মূল হোতা। বিশ্বাসঘাতক বলতে মীর জাফরের নামের উদাহরণ এখন একটি প্রবাদ। চিত্ত ভৌমিক সাবলীল অভিনয়ে পারঙ্গমতা দেখালেও যাত্রা পালায় কণ্ঠ ও অভিনয়ভঙ্গিমার যে রূপ তার কিছুটা ঘাটতির কারণে চরিত্রটি ঠিক প্রকটভাবে উঠে আসেনি। দেওয়ান মোহন লাল বীরত্ব, কর্তব্য পরায়ণ এবং নবাবের অত্যন্ত অনুগত একটি শক্তিমান চরিত্র। সুব্রত পুরু খুব সতর্ক এবং মনোযোগী ছিলেন এই চরিত্রের রুপদানে। ক্যাপ্টেন ওয়াটস-এর ভূমিকায় ছিলেন ম্যাক আজাদ। জগৎ শেঠ ও উমিচাঁদের ভূমিকায় ছিলেন অনুপ সেনগুপ্ত ও দিলীপ দাস।

দৃশ্যের ধারাবাহিকতায় পরিশেষে আসে সেই পলাশীর যুদ্ধ। ২৬০ বছর পূর্বে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আমবাগানে ইংরেজ ও নবাবের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে কুচক্রী প্রধান সেনাপতি মীর জাফরের নেতৃত্বে  প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকারীদের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে নবাবের পরাজয় ঘটে। ফলে বাংলার স্বাধীনতা প্রায় দু'শ বছরের জন্য অস্তমিত হয়। মঞ্চে দেখা যায় নবাবের পায়চারি, পাশে গোলাম হোসেন এবং আলেয়া।  এই দৃশ্যে নবাব সিরাজউদ্দৌলার চরিত্রে যুদ্ধের উত্তাপ, সৈন্যদের পরাজয় এবং পতনের যে বেদনাময় ভাবাবেগ তার স্পষ্ট প্রকাশ ঘটেনি। গোলাগুলির শব্দ কিছুটা উপভোগ্য হলেও যুদ্ধের উত্তেজনা, উৎকণ্ঠা, বিভীষিকা মঞ্চে তেমন প্রতিফলিত হয়নি। আলোর ঝলকানি, ছুটন্ত ঘোড়ার শব্দ, পদশব্দ, সৈন্যদের হাহাকার, চিৎকার কিংবা উল্লাসধ্বনি ব্যবহার করে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে ফুটিয়ে তোলা যেত।প্রবাসে শেকড়ের টানে টরন্টোতে প্রথম যাত্রাপালা

শেষ দৃশ্যে ঘাতক মোহাম্মদী বেগের হাতে নিহত হন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। ঘাতক মোহাম্মদী বেগ-এর চরিত্রে ছিলেন মোস্তফা দুলারী। নবাব সিরাজউদ্দৌলার মৃত্যু দিয়ে সমাপ্তি ঘটে যাত্রাপালার। শেষ দৃশ্যের আবেগঘন পরিবেশ হালকা হয়ে উঠে মনোযোগী বোদ্ধা দর্শকদের তুমুল করতালির মধ্যে দিয়ে।

নবাব সিরাজউদ্দৌলা যাত্রাপালাটির পুরো নির্দেশনায় ছিলেন মানিক চন্দ ও সুব্রত পুরু।পালাটি রচনা করেন শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত।

নৃত্য পরিবেশনায় ছিলেন - তাসনীম আহমেদ, শ্রেয়া সাহা, নাজিয়া হক, রচনা খন্দকার প্রার্থনা পল, রায়না রাকিব এবং রিদা রহমান।

নৃত্য পরিচালনা, রূপসজ্জা ও পোশাক সরবরাহে অরুনা হায়দার তার দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। রূপসজ্জা সহকারী ছিলেন আনিয়া হক।

মঞ্চসজ্জায় কাজ করেছেন জীন ইসলাম এবং উপস্থাপনা ছাড়াও সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন অজন্তা চৌধুরী।

প্রথম প্রযোজনা হিসেবে কিছুটা ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকাটা স্বাভাবিক। প্রবাসীরা বরাবরই এই বিষয়ে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে চান। কেননা প্রবাসের কর্মমুখর ব্যস্ত জীবনের মাঝে সময় করে এই শিল্প-সাহিত্যের চর্চা শুধুমাত্র দেশ এবং ঐতিহ্যকে ভালোবেসে প্রাণের তাগিদে করা। তাই টরন্টো থিয়েটার প্লাস-এর এই স্বাপ্নিক উদ্যোগ টরন্টোতে প্রথম যাত্রাপালার আয়োজন বিপুল দর্শকদের সাধুবাদ অর্জন করেছে। তারা চেষ্টা করেছেন সার্বিক পরিবেশনা দর্শক উপভোগ্য করতে।

বর্তমানে বাংলাদেশে যাত্রার ক্ষেত্রে আধুনিক এবং পাশ্চাত্যের বিনোদনের সংমিশ্রণে অশ্লীলতার দোষে দুষ্ট হয়ে  শিল্প শৈলী থেকে সরে গিয়েছে। আর তাই শিক্ষিত সমাজের যাত্রা সম্পর্কে অবজ্ঞা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত হয়ে মূল যাত্রাশিল্প অবক্ষয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে আজ চরম সংকটপূর্ণ অবস্থায়। প্রবাসের এই দূর প্রাঙ্গণে বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে পরিশিল্পিত আধুনিক ধারায় পুনরোদ্ধারের এই উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।

 

ছবি কৃতজ্ঞতা : পলাশ এবং খুরশীদ শাম্মী

২২ মার্চ, ২০১৭ ২৩:৪৭:৫৮