ভিন্ন আঙ্গিকে মাতৃভাষা দিবস উৎযাপন
ফারজানা তাসলীম রূপা
অ+ অ-প্রিন্ট
১৯ ফেব্রুয়ারির দিনটি টরন্টো শহরের প্রতি ছিল অনেক বেশী সদয়; শীতের উষ্ণতা কাকে বলে সেদিন সবাই জেনেছিল। সেই উষ্ণতার সাথে একাকার হতে মিলেছিল আরও কিছু মানুষের উষ্ণতায় ভরা মন। আমরা পৌঁছেছিলাম বার্চমাউন্ট রোডের অ্যালবার্ট ক্যাম্পবেল লাইব্রেরি মিলনায়তনে ঠিক বিকেল তিনটায়। কিছু উদ্যোগী মানুষের মানসপটে আঁকা হচ্ছিল আসন্ন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে সামনে রেখে ভিন্নধর্মী এক আয়োজনের দিনলিপি। অধিকাংশের পরনে সাদা কালো বসন হলেও মনের আকাশে বিচিত্র রঙে ছড়িয়ে পড়েছিল এক বীরত্বের গৌরবগাঁথা। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেধাবী ছেলেমেয়েগুলোর কেউ উপস্হাপনা করবে, কেউ নাচবে, কেউ আলোচনায় অংশ নেবে। এদের প্রত্যেকেই যেন একেকটা হীরকখন্ডের মত চারদিক আলো করে রেখেছিল। প্রস্তুতির চুড়ান্ত পর্ব শেষে উৎসব শুরু হলো ঠিক বিকেল চারটায়।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী উপস্হাপক এক ঝলমলে তরুন অর্ক ভট্টাচার্য। সূচনা বক্তব্য শেষে স্বাগত জানালেন দর্শক শ্রোতাদের এবং মঞ্চে আহ্বান করলেন একজন একজন করে  বিচেস-ইস্ট ইয়র্ক-এর দুই সংসদ সদস্য ন্যাথানিয়েল এরকিন-স্মিথ, আর্থার পটস এবং বিএলআরসি সভাপতি ড. রাখাল সরকারকে। তারা সকলেই তাদের বক্তব্য দিয়ে গেলেন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ইতিহাস এবং তাৎপর্য বিষয়ে। দর্শকরা করতালিতে ফেটে পড়ে তাদের বক্তব্যের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করলেন।

এরপর অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্ব - ‘ল্যাঙ্গুয়েজ: স্টোরিজ অব দ্য ইয়ুথস’! বহুভাষাভাষী যেসব তরুণ-তরুণীরা এতে অংশ নেন তারা হলেন জসুয়া গ্রনডিন, অমর অজয়ল্যাচমান, শরমিলা সেনথিলমনোহরন, এলিনা ড্রোনোভা, জুনিং (শ্যারন) শি এবং  হাসিব করিম। দুই অনন্যা ব্রতী দাসদত্ত এবং জ্যোতি দত্ত পুরকায়স্থর সাবলীল উপস্হাপনায় কানাডার বহুভাষাভাষী সমাজে পূর্বপুরুষের ভাষার প্রবহমানতা নিয়ে নিজ নিজ গল্প বলে যান বক্তারা। মাতৃভাষায় এরা কেউ-ই হয়তো পুরোপুরি সাবলীল নন; কিন্তু আবেগের ভাষা, আপনজনের সাথে হেসে কেঁদে গল্প জুড়িয়ে দেয়ার ভাষা, শিকড়ের সাথে যোগাযোগের ভাষাতো কেবলই মাতৃভাষা। এরা কেউই সেটা জোরালো কন্ঠে উচ্চারণ করতে ভোলেননি। এ পর্বের সর্বকনিষ্ঠ বক্তা হাসিব করিমের একটা লাইন বড় মনে ধরলো, “I am a citizen of Canada. But how can I establish myself to be a Canadian without knowing my own language, Bangla?”

তৃতীয় পর্বটি সবচাইতে আকর্ষণীয়। ১৯৫২ সালের মহান একুশে ফেব্রুয়ারির কাহিনিকে একটি নৃত্যালেখ্যর মাধ্যমে উপস্থাপনা করেন সূচনা দাস বাঁধন, শ্রেয়সী প্রামানিক, রাধিকা ভট্টাচার্য, আরিত্রি ভট্টাচার্য, সুকন্যা চৌধুরী,  সামারা, নিশুতি সাহা প্রমূখ। পর্বটি পরিচালনার দায়িত্ব ছিল কৃত্যা চৌধুরী এবং চিত্তা চৌধুরী ঘাড়ে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে একুশ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ঘটনা বর্ণন হয় নৃত্যের ঝংকারে। চমকে উঠেছিলাম শ্রোতা দর্শকদের সাথে আমিও! দিনটা কি ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ নাকি ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২? ভীষণ ধান্ধায় পড়ে গিয়েছিলাম। কী করে ভালোবাসার ভাষা শহীদদের সাথে মরে গিয়ে আবার বেঁচে উঠলাম ২০ মিনিট পরে সেটা সেই সময়ই কেবল বলতে পেরেছিল।

চতুর্থ পর্ব প্যানেল আলোচনা - অংশ নেন বিচেস-ইস্ট ইয়র্ক এলাকার সাবেক সংসদ সদস্য রবীন্দ্রপ্রেমী মেথিউ কেলওয়ে, ‘বিচমেট্রো নিউজ’ পত্রিকার সম্পাদক আনা কিলেন, মুক্তচিন্তক আকবর হোসেন, ইংরেজি-ভাষী বাঙালি কবি সব্যসাচী নাগ এবং টরন্টোর পরিচিত উর্দু কবি ভাকার রাইস। প্রত্যেকেই নিজ নিজ জায়গা থেকে ভাষা বিষয়ে তাদের  ভাবনার  ঘুড়ি উড়িয়েছিলেন, নাটাই ধরা  ছিল দুই উপস্থাপক অদিতি জহির ও সুবর্ণ চৌধুরীর হাতে। আমরা জানতে পারলাম সংবাদে, রবীন্দ্র সাহিত্যে, কবিতায় ও সর্বোপরি মানুষের মানস জগতে ভাষা কী করে ধার কাটে কিন্তু ধারে কাটে না। প্রত্যেকের সাবলীল মতামত, প্রশ্নোত্তর ও কথার পরিক্রমায় বুঁদ হয়েছিল শ্রোতাসকল।

পঞ্চম পর্ব কবি আসাদ চৌধুরী ও তার কানাডাপ্রবাসী পরিবার নিয়ে একটি পুরস্কারপ্রাপ্ত ডকু চিত্র ‘মাদার টাং’। শুরুতে পরিচালক নাদিম ইকবাল সিনেমাটি বানানোর প্রেক্ষাপট বলেন।  চলতি জীবনে কখনও আটকে পড়া ভাবনার ভাষারা আপন মুক্তির পথ চিনে নেয় সূর্যের হাত ধরে। আমরাই তো আমাদের বুঝি, ভাষা দিয়েই কেবল নয়, স্নেহ দিয়ে, ভালবাসা দিয়ে, দূরে চলে গিয়েও আবার কাছে টেনে আনার আরাধনা বড় বেশী প্রকট কবি আসাদ চৌধুরীর মত আমাদের সবার মাঝে।

সবশেষে ইতিপর্ব টানেন সূচনা দাস বাঁধন, ঝকঝকে মেধাবী এবং বহু প্রতিভাময়ী এই তরুনী নেচেছেন একটু আগেও। আন্তর্জাতিক ভাষা বাংলা নয়, তবে ভাষার আন্তর্জাতিক অবকাঠামো তৈরী করেছে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। গর্বে বুকটান করি তাই জন্যে! অনুষ্ঠান শেষে আবেগাপ্লুত, মোহাবিষ্ট হয়ে একেক করে ঘরে ফিরি।ভিন্ন আঙ্গিকে মাতৃভাষা দিবস উৎযাপন

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০৫:১৫:৪০